শিরক নিয়ে কিছু কথা

শিরকশিরক আভিধানিক অর্থঃ অংশ। الشِّرْكُ শব্দের মাছদার বা ক্রিয়ামূল হ’ল الاِشْرَاكُ (আল-ইশরাক) অর্থঃ শরীক করা।

শিরক পারিভাষিক অর্থঃ আল্লাহর সত্তা অথবা গুণাবলীর সাথে অন্যকে শরীক করা।

শিরকের পরিচয় দিয়েছেন আল্লাহর রাসূল সা. এভাবেঃ أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدّاً وَهُوَ خَلَقَكَ ‘আল্লাহর জন্য অংশীদার সাব্যস্ত করা, অথচ তিনি (আল্লাহ) তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’।

শিরকের সংগা দিতে আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেনঃ الشرك هو أن يتخذ من دون الله نداً يحبه كما يحب الله ‘শিরক হ’ল আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ গ্রহণ করা এবং আল্লাহর মত তাকে ভালবাসা’।

শিরক-এ বিপরীত হ’ল তাওহীদ আর তাওহীদের বিপরীত হ’ল শিরক।

শিরকের ভয়বহতা ও পরিণতিঃ

১. শিরক ক্ষমার অযোগ্য একটি অপরাধ। আল্লাহ শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না। কুরআনে বলা হয়েছেঃ

﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا﴾

“আল্লাহ অবশ্যই শিরককে মাফ করবেন না। এ ছাড়া অন্যান্য যত গোনাহ হোক না কেন তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে আর কাউকে শরীক করেছে সে তো এক বিরাট মিথ্যা রচনা করেছে এবং কঠিন গোনাহের কাজ করেছে”। (সূরা আন নিসাঃ ৪৮)

﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا﴾

“আল্লাহ কেবলমাত্র শিরকের গোনাহ মাফ করবেন না। এ ছাড়া আর যাবতীয় গোনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করে, সে গোমরাহীম মধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে”। (সূরা আন নিসাঃ ১১৬)

২. শিরক জাহান্নাম ওয়াজিব করে দেয়। শিরক মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। আল্লাহ বলেনঃ

﴿لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ ۖ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ ۖ إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ ۖ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ﴾

“নিসন্দেহে তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে, মারইয়াম পুত্র মসীহই আল্লাহ। অথচ মসীহ বলেছেন, হে বনী ইসরাঈল! আল্লাহর বন্দেগী করো, যিনি আমার রব এবং তোমাদেরও রব। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেছে, তার উপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। আর এধরণের জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই”। (সূরা আল মায়িদাহঃ ৭২)

ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ

مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِىْ لاَيُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قَالَ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ.

‘আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে থাকে তবুও? তিনি বললেন, যদিও সে যেনা করে এবং চুরি করে থাকে’।

অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ

مَنْ لَقِىَ اللهَ لاَيُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَقِيَهُ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ.

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।

৩. শিরক পূর্বের আমল সমূহ বিনষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বান্দার সৎ কাজগুলোকে বৃদ্ধি করে দেন। কিন্তু শিরক বান্দার ভাল আমলগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ বলেনঃ

﴿ذَٰلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۚ وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾

“এটি হচ্ছে আল্লাহর হেদায়াত, নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে তিনি যাকে চান তাকে এর সাহায্যে হেদায়াত দান করেন। কিন্তু যদি তারা কোন শিরক করে থাকতো, তাহলে তাদের সমস্ত কৃতকর্ম ধ্বংস হয়ে যেতো”। (সূরা আল আনআমঃ ৮৮)

﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ “(তোমার উচিত তাদের একথা স্পষ্ট করে বলে দেয়া। কারণ) তোমার কাছে এবং ইতিপূর্বেকার সমস্ত নবীর কাছে এ ওহী পাঠানো হয়েছে যে, যদি তুমি শিরকে লিপ্ত হও, তাহলে তোমার আমল ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাবে”। (সূরা যুমারঃ ৬৫)

৪. শিরক সবচেয়ে বড় গুনাহ। কবীরা তথা বড় গুনাহের একটি হ’ল শিরক। একবার রাসূলুল্লাহ সা. সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বললেনঃ

أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ قُلْنَا بَلَى يَارَسُوْلَ اللهِ. قَالَ اَلْإِشْرَاكُ بِاللهِ، وَعُقُوْقُ الْوَالِدَيْنِ.

‘আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে সংবাদ দিব না? আমরা বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল সা.! তিনি বললেনঃ আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া’।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেনঃ

اِجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوْبِقَاتِ قَالُوْا يَارَسُوْلَ الله وَمَا هُنَّ؟ قَالَ الشِّرْكُ بِاللهِ، وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِىْ حَرَّمَ اللهُ إِلإَّ بِالْحَقِّ وَأَكْلُ الرِّبَا وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيْمِ وَالتَّوَلِّىْ يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاَتِ الْغَافِلاَتِ وَالْمُمْنِاَتِ.

‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থেকো। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল সা.! ঐ ধ্বংসাত্মক জিনিসগুলো কি কি? তিনি জবাবে বললেনঃ ১. আল্লাহর সাথে শরীক করা, ২. যাদু করা, ৩. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা-যা আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন, ৪. সূদ খাওয়া, ৫. ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, ৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা, এবং ৭. সরলা নির্দোষ সতী-সাধ্বী মুমিনা মহিলাকে অপবাদ দেওয়া’।

অন্য হাদীসে রাসূল সা. বলেনঃ

‘সবচেয়ে বড় গুনাহ তিনটি ১. আল্লাহর সাথে শরীক করা। ২. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। এবং ৩. মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া’।

৫. শিরক জঘন্যতম পাপ। যেসব কাজ করলে আল্লাহর আনুগত্যের পরিবর্তে পাপ অর্জিত হয় শিরক তার অন্যতম। শিরককে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা. জঘন্যতম পাপ বলে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন, “যে আল্লাহর সাথে শিরক করল সে জঘন্য পাপ করল”। (সূরা নিসাঃ ৪৮)

আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ

قُلْتُ يَارَسُوْلَ اللهِ أَىُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ؟ قَالَ: أَنْ تَجْعَلَ لِلّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ.

‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট জঘন্যতম পাপ কোনটি? জবাবে তিনি বললেনঃ কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো (শরীক করা), অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’।

শিরক পাঁচ প্রকার। যথাঃ (১) জ্ঞানগত শিরক (২) ব্যবহারগত শিরক (৩) ইবাদতে শিরক (৪) অভ্যাসগত শিরক (৫) ভালবাসায় শিরক। এগুলি হ’ল বড় শিরক বা ‘শিরকে আকবার’। এতদ্ব্যতীত ‘শিরকে আছগার’ বা ছোট শিরক হ’ল ‘রিয়া’ বা লোক দেখানো দ্বীনদারী। যা বড় শিরকের এক দর্জা নীচে এবং সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ।

১. জ্ঞানগত শিরকঃ এর অর্থ হ’ল আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী মনে করা, বিপদ-আপদে অন্য কোন অদৃশ্য সত্তাকে আহবান করা, অন্যের নামে যিকর করা বা ধ্যান করা ইত্যাদি।

২. ব্যবহারগত শিরকঃ এর অর্থ সৃষ্টির পরিকল্পনা ও সৃষ্টি জগতের পরিচালনায় অন্য কাউকে শরীক গণ্য করা। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকেই মুসলমানের রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারনীতি, শিক্ষানীতি, ধর্মীয় নীতি, সমাজনীতি সবকিছু পরিচালিত হবে। এটাই হ’ল তাওহীদের মূল কথা এবং এর বিপরীতটাই হ’ল শিরক।

৩. ইবাদতে শিরকঃ এর অর্থ হ’ল ইবাদত বা উপাসনার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করা। যেমন আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সিজদা করা, অন্যের নামে যবহ করা, মানত করা, অন্যের নিকটে প্রার্থনা করা, অন্যকে ভয় করা, আকাঙ্ক্ষা করা, যে আনুগত্য ও সম্মান আল্লাহকে দিতে হয় সেই আনুগত্য ও সম্মান অন্যের প্রতি প্রদর্শন করা, কবরপূজা করা ইত্যাদি। পৃথিবীর সবচাইতে প্রাচীনতম শিরক হ’ল মূর্তিপূজা।

৪. অভ্যাসগত শিরকঃ এর অর্থ হ’ল মানুষ অভ্যাস বশতঃ অনেক সময় শিরক করে থাকে। শিরকী কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে, হালালকে হারাম করে, হারামকে হালাল করে ইত্যাদি। যেমন বিশ্বব্যাপী প্রচলিত রেওয়াজের দোহাই দিয়ে দেশে সূদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু রাখা, কারো সম্মানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা, নিজেদের বানানো শহীদ মিনার, শিখা অনির্বাণ, শিখা চিরন্তন, স্মৃতিসৌধ, ভাষ্কর্য, টাঙ্গানো ছবি বা চিত্রে ইত্যাদিতে ফুলের মালা বা পুষ্পাঞ্জলী নিবেদন করা।

৫. ভালবাসায় শিরকঃ এর অর্থ বান্দার ভালবাসাকে আল্লাহর ভালবাসার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। অর্থাৎ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত বিধানের ঊর্ধ্বে কোন মুজতাহিদ ইমাম, মুফতী, পীর-আউলিয়া বা শাসনকর্তার আদেশ-নিষেধ ও বিধান সমূহকে অধিক ভালোবাসা ও তদনুযায়ী আমল করা।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আমাদেরকে ছোট বড় সকল ধরণের শিরক থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিন। আমীন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s