সত্য ও সুন্দরের পথে অবিরাম পথ চলা

আভ্যন্তরিন কলহে জর্জরিত যখন ইসলামী ছাত্রশিবির

আভ্যন্তরিন কলহে জর্জরিত যখন ইসলামী ছাত্রশিবির, তখন আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। সালটা ১৯৮২। পড়ি মৌলভী বাজার জেলার বড়লেখাতে অজোঁপাড়া গায়ে অবস্থিত সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসাতে। তদানিন্তন সময়ে ছোট্ট ক্লাশে থাকা একজন কিশোরের কাছে বোধগম্য হচ্ছিল না যে,
** জামায়াতের লেজুড় ভিত্তি করা হবে কি না? ** জামায়াতের সাথে নন কো-অপারেশন কি?
তখনকার সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবির নামক জিনিসটাকে ভাল করে বুঝতাম না। কিন্তু প্রতি বৃহস্পতিবার হলেই আমরা টানাটানির শিকার হতাম। মাদ্রাসার একদল ছাত্র যারা আমাদেরকে মাদ্রাসা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত তাদের প্রোগ্রামে আহবান করতেন। অপর একদল ছাত্র আমাদেরকে মাদ্রাসা ছাত্রসংসদ অফিসে অনুষ্ঠিত প্রোগ্রামে আহবান করতেন। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আজিজুর রাহমান শাহবাগী মরহুম। ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি।তিনি দূ’পক্ষকেই সুযোগ দিতেন মিটিং করার। তবে প্রতিটি মিটিং এ সভাপতিত্ব করার জন্য মাদ্রাসার ১জন করে শিক্ষককে দিতেন-যাতে করে কোন ধরণের সমস্যা না হয়। আমরা অবশ্য যে মিটিং এ ভাল খাবার থাকতো, সেই মিটিং-এ যেতাম। উল্লেখ্য যে, তখনকার সময় সব মিটিংএ খাবারের ব্যবস্থা রাখা হতো।
১৯৮২ সালে এক অনাকাংখিত আভ্যন্তরিক সমস্যায় ছাত্রশিবিরের মাঝে ফাটল দেখা দেয়। সেই সময়ে বড়লেখা থানা শিবিরের সভাপতি ছিলেন জনাব আইয়ুব আলী ভাই-যার বাড়ী দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের তারাদরমে। সেই সময়ে বড়লেখা থানার সকল সাথী জামায়াতের সাথে নন-কোঅপারেশন গ্রুপে চলে যান। দূর্ভাগ্য জনক হলেও সত্য যে, সেই সময়ের সুজাউল মাদ্রাসার মেধাবী ছাত্রদের একজনও শিবিরের সাথী ছিলেন না। কিন্তু মেধাবীদের প্রায় সকলেই ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সমর্থন করতেন।
১৯৮২ সালে বড়লেখা থানা শিবিরের সকল সাথী যখন জামায়াতের সাথে নন-কোঅপারেশনে, তখন সেই মেধাবীরা হঠাৎ করে ঝলকে উঠেন। জনাব ফয়জুর রহমান ওরফে জিহাদী, জনাব হাফেজ নিজাম উদ্দিন এবং জনাব গৌছ উদ্দিন সহ মেধাবীরা নন-কোঅপারেশনে না গিয়ে জামায়াতের সাথে কো-অপারেশনে চলে আসেন এবং হঠাৎ করে দেখা যায় তারা সীমাহীন সক্রিয় ইসলামী ছাত্রশিবিরে।
৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া ১৯৮২ সালের এক কিশোরের কাছে ছাত্র রাজনীতি বা সংগঠন বিষয়টা ছিল দূর্বোধ্য। তাই ভাল ছাত্রের ভীড় কোন দিকে সেইটা বিবেচনায় নিয়ে জামায়াতের সাথে কো-অপারেশনের গ্রুপের দিকে দূর্বল হয়ে গেলাম। কিন্তু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংগঠনে ভর্তি হওয়া থেকে দূরে থাকলাম।
এদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের আভ্যন্তরিন কোন্দল চরম আঁকার থেকে সংগঠন বিভক্তির দিকে চলে যায়। জন্ম হয় নতুন আরেক সংগঠনের । তারও নাম ইসলামী ছাত্র শিবির। সাথে প্রতিষ্ঠা করা হয় নতুন যুব সংগঠন ইসলামী যুব শিবির। শুরু হয় নতুন শ্লোগান “একই আন্দোলনের দূ’টি স্থর, ছাত্রশিবির-যুবশিবির”। আর এই বিভক্তি করণে গুরু হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের খন্ডকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জনাব আব্দুল কাদের বাচ্ছু। অবশ্য তিনি পরে নাম পরিবর্তন করে হোন আহমদ আব্দল কাদের। যিনি এখন অধ্যাপক আহমদ আব্দুল কাদের নামে পরিচিত।
আমরা দেখতে দেখতে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৪ সালে চলে এসেছি। ১০শ্রেণীর ইচড়ে পাঁকা ছাত্র আমরা। ক্লাশের ফাস্ট বয় মুহাম্মদ জিয়াউর রাহমান (গল্লাসংগন-লন্ডনপ্রবাসী)। দুষ্ঠের শিরোমণি। পড়া লেখায় যেমন অতুলনীয়, দুষ্ঠুমীতেও তেমন অন্যন্য। তার নেতৃত্বে আমরা গ্রুপ করেছি, যার মূলমন্ত্র হলোঃ কোন সংগঠনে আমরা যোগ দেবোনা।
১৯৮৪ সাল পর্যন্ত আমরা সেই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত থাকলাম। এদিকে আমাদেরই ক্লাশের জনাব আকমল হোসাঈন ভাই (জুড়ি-মানিকসিংহ) দেখতে দেখতে শিবিরের কির্মী হয়ে গেলেন। বিধায় তার সাথে আমরা গড়ে তুললাম নন-কোঅপারেশন। এতোদিন যা জামায়াতের সাথে চলেছে, তা শ্রেণী ভিত্তিক রূপ নিল আকমল ভাইয়ের সাথে। আমাদের এক কথা, তুমি ক্লাশের সিদ্ধান্ত অমান্য করে শিবিরে যোগদান করেছো। তোমার সাথে কোন সহযোগিতা নাই।
এর মধ্যে দুই দল প্রকাশ্য রূপ নিল। দুই দলই তাদের দলে ভীড়াতে দাওয়াতী কাজে তৎপর। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার হলে দাওয়াতী কাজের মাত্রাটা আরেকটু বেড়ে যায়। এর মাঝে শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জনাব নজরুল ইসলাম খাদেম (ব্রাম্মনবাড়ীয়া) এবং শিবিরের সিলেট জেলা সভাপতি ডা. ফরিদ উদ্দিন (সিলেট মেডিক্যাল-মাদারীপুর) সহ অনেক নেতৃবৃন্দের বক্তব্য শুনার সুযোগ হয়ে গেছে খাবারের লোভে বিভিন্ন প্রোগ্রামে উপস্থিত হয়ে।
১৯৮৪ সালে হঠাৎ করে সুজাউল মাদ্রাসায় শুরু হলো মাওলানা মঈনুদ্দিন বিরুধী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের দাবী দাওয়া আমাদেরকে যেভাবে বুঝানো হয়েছিল, সে অনুযায়ী আমরা ১০ম শ্রেণীর প্রায় সকল ছাত্র আন্দোলনে একমত হয়ে আন্দোলনে শরীক হই। আর সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল জামায়াতের সাথে কো-অপারেশন ওয়ালা ইসলামী ছাত্রশিবির।
১৯৮৪ সালে ২১শে সেপ্টেম্বর, জুমুয়ার দিন। চলতে চলতে কখন যে, একদিন এই শিবিরের এতো কাছে চলে এলাম তা নিজেই খেয়াল করিনি। জনাব মাওলানা ফয়জুর রাহমান, জনাব হাফেজ নিজাম উদ্দিন এবং জনাব গৌছ উদ্দিন আর মুদ্দাস্সির হোসাঈন (সাগরনাল) ভাইয়ের দাওয়াতে হাজির হলাম শিবিরের এক বিশেষ সভায়। সেখানে দারসে কুরআন পেশ করলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সিলেট জেলা শাখার তদানিন্তন সভাপতি জনাব ডা. ফরিদ উদ্দিন। প্রোগ্রাম শেষে আমাকে বাড়ীয়ে দেয়া হলো সাদা জমিনে কালো বর্ণে আঁকা একটি ফরম। ইসলামী ছাত্রশিবিরে ভর্তি হওয়ার সমর্থক ফরম। পুরণ করার জন্য বলা হলো। আমি তলে তলে তখন অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। সেদিন কোন না বলার চিন্থাই মাথায় আসেনি। ফরমটি পুরণ করে তুলে দিলাম সেই সময়ের দায়িত্বশীল হাফেজ নিজাম ভাইয়ের কাছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করলাম।

আমি তখন শিবিরের পলাতক কর্মী

দিনটা ছিল সম্ভবতঃ বৃহস্পতিবার। ২৭শে সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ হওয়ার কথা। শিবিরে যোগদানের এক সপ্তাহ পূর্তি। গত সপ্তাহে ২১ সেপ্টেম্বর তারিখে আমি শিবিরে যোগদান করেছি। এখন শরীরের মধ্যে একটা পুলক পুলক ভাব। শিবিরের আদ্যোপান্ত কিছুই না জানলেও নিজেকে শিবিরের একজন ভাবতে ভালই লাগছে। এতো দিন পরে কেন জানি মনে হচ্ছে আমি ফয়জুর রাহমান ভাই, হাফেজ নিজাম ভাই এবং গৌছ ভাইদের নিজেদের লোক।

মাদ্রাসা শেষে জনাব হাফেজ নিজাম ভাইয়ের সাথে দেখা। বললেনঃ নজরুল, আগামীকাল তোমাকে মিছিলে যেতে হবে। কি মিছিল? কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে মিছিল? কি মিছিল? স্বৈরাচরী এরাশাদের বিরুদ্ধে মিছিল। এই মুহুর্তে দরকার-কেয়ারটেকার সরকার। বললেন, নাম লিখবো? বললামঃ লিখেন।

পরদিন হাজির হলাম মিছিলে। বড়লেখা থানা সদরে। মিছিলের বেশীর ভাগ লোককে চিনিনা। যথারীতি মিছিল হলো। মিছিল শহর ঘুরে চলে গেলো বড়লেখা রেলওয়ে স্টেশনে। সেই সময়ে মিছিলের কালচার ছিলঃ বেশীর ভাগ মিছিল শুরু হতো ঐতিহাসি শিরিশতলা থেকে। শিরিশতলার সেই শিরিশ গাছ এখান আর নেই। বড়লেখা হাজিগঞ্জ বাজার মসজিদের সামনে ছিল সেই গাছটি। বড়লেখার হাজার হাজার মিছিল আর সমাবেশের সাক্ষী এই শিরিশতলা।

মিছিল শিরিশতলা থেকে শুরু হয়ে বড়লেখা পিসি হাই স্কুলের শেষ প্রান্ত অবধি গিয়ে ফিরে আসতো উত্তর দিকে। চলে যেতো ডাক বাংলো পেরিয়ে খাদ্য গুদাম পর‌্যন্ত। এর পর ফিরে এসে বড়লেখা স্টেশন রোডে গিয়ে রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঘুরে আবার শিরিশতলায় এসে পথ সভার মাধ্যমে শেষ হতো।

বয়সের স্বল্পতার কারণে সেদিন কি ঘটেছিল তা জানা নেই বা মনে নেই। হঠাৎ করে গুলির শব্দ শুনলাম। এর পর ভোঁ দৌড়। সবার মতো আমিও দৌড় দিলাম। কোন দিকে থেকে কোন দিক থেকে এসেছি-আমার মনে নেই। হঠাৎ একটি বাসার গেইট থেকে লোকজন আশ্রয় নেয়ার জন্য ডাকলো। সাথে সাথে বাসায় ঢুকে গেলাম। বাসায় ঢুকেছি ঠিকেই, কিন্তু বের হওয়ার নাম নেই। আমি এখন শিবিরের পলাতক একজন কর্মী। কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলাম আমার সাথে আরো ক’জন আছেন। এর মাঝে একজন সুড়িকান্দির আহমদ ভাই (মাওলানা আহমদ ভাই) আর অপর জন মাইজ পাড়ার আহমদ ভাই। আরো অনেকে ছিলেন, যাদের কথা আমি মনে করতে পারছিনা।

২/৩ঘন্টার এখানে বসার পর আহমদ ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে চলে গেলাম পূর্ব দিকে। হাটবন্দ এলাকার গলিপথ ধরে গিয়ে উঠলাম জফরপুরের রাস্তা হয়ে বড়লেখা উত্তর চৌমুহনায়। গন্তব্য সুজাউল। আহমদ ভাইয়ের সাথে একই মাদ্রাসার ছাত্র হিসাব পরিচিতি ছিল। উনি আমাকে অভয় দিলেও দেখলাম উনিও ভয়ে কম্পমান।

পরে জানতে পারলাম, পুলিশ মিছিলে গুলি চালিয়েছিল। পুলিশ অনেককে মারধর করেছে। একই দিনে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গুলাগুলি হয়েছে। আওয়ামীলীগ নেতা মইজ উদ্দিন এই দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

সেই সময়ের বয়সে কার খবর কে রাখে। চাচা, আপনা জান আপনে বাঁচা। নিজের জান বাচিয়ে পায়ে হেটে চলে এলাম নিজের থাকার আবাসে।

এদিকে হাফেজ নিজাম উদ্দিন গুলির মুখে খোঁজছেন আমাকে। তিনি আমাকে মিছিলে নিয়ে এসেছেন। এখন আমি উনাকে না বলে চলে এলাম। এটাতো সাংঘাতিক কথা। তিনি ভয় ভীতি উপেক্ষা করে একবার হাসপাতালে যাচ্ছেন, আরেকবার থানাতে যাচ্ছেন, অন্যবার বড়লেখা বাজারে আসছেন। এক সময় উনাকে কে জানি খবর দিলো, আমাকে সে নাকি মুড়াউলে দেখেছে। ফলে তিনি রণে ভংগ দিয়ে বাসায় ফিরলেন। আমি যে পলাতক, আমাকে যে কেউ খোঁজতে পারে, এই অনুভূতিটুকু তখন আমার ছিলনা। আমার কেবল একটাই চিন্তা-আমি একজন পলাতক কর্মী।

পরদিন মাদ্রাসায় হাজির হয়ে জনাব নিজাম ভাইয়ের সাথে দেখা। মিষ্টি সুরে তিনি দুষ্টু একটা বকা দিলেন। এর পর ঘটনা যদি এখানেই শেষ হয়ে যেতো, তাহলে হয়তো আমার স্মৃতি থেকে এই ঘটনা হারিয়ে যেতো। কিন্তু পরের কাহিনী আমাকে আরো অপরাধী করে দিলো।

২/৪দিন পর আবার ঘোষনা আসলো, বড়লেখার শিরিশতলায় গতদিনের ঘটনার প্রতিবাদে প্রতিবাদ সমাবেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে। ”আমি যাবো” সাথে সাথে ঘোষনা দিয়ে দিলাম। কিন্তু তখনকার দিনের বড়রা আমাকে নিবেন না। সরাসরি নিষেধ করলেন। বললেন, প্রোগ্রাম রাত পর্যন্ত চলবে, তাই ছোটদের নেয়া হচ্ছে না। আমি তখন বড়লেখাকে ভালভাবে চিনি। কারণ তখনকার দিনে আমি লাতুর গাড়ীর নিয়মিত প্যাসেঞ্জার ছিলাম। রেলগাড়ীর হকারদের বাদাম আর চানাচুরের আমি নিয়মিত ক্রেতা ছিলাম। স্টেশন রোডে আলু বাজি (আলু বিরান) হলে তো আর কথাই নাই।

উনারা আমাকে নেবেন না। কিন্তু আমি কি উনাদের সাথে যাচ্ছি? প্রতিবাদ সমাবেশে সেদিন আমাকে ঠিকমতোই দেখা গেল। বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ। মঞ্চ বলতে যা ছিল, তা হলো চয়নিকা গার্মেন্টস-এর সামনে তদানিন্তন সময়ের কামাল সাবানের একটা লাকড়ির কাটূন বসানো হলো। বক্তা সেখানে দাড়িয়ে বক্তব্য দিলেন। বক্তব্য যারা দিলেন, তাদের সংখ্যা অনেক ছিল। এখনকার বড়লেখা জামায়াতে ইসলামীর আমীর সে সময়ে বড়লেখা বা কুলাউড়া থানা শিবিরের সভাপতি হিসাবে বক্তব্য রেখেছিলেন-এটা আমার মনে আছে। মনে আছে জনাব আব্দুল মান্নান ভাইয়ের কথা, যিনি সে সময় ছিলেন থানা জামায়াতের আমীর। আজকের এই দিনে তিনি অসুস্থ আছেন, চিকিৎসাধিন আছেন। আর ছিলেন জনাব ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মালিক, যিনি সে সময়ে জামায়াতের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং মাত্র কিছু দিনের পরে তিনি রুকন হন এবং পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় বড়লেখা থানা জামায়াতের আমীর ছিলেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকা প্রবাসী। অতিথিদের মাঝে বক্তব্য রেখেছিলেন বর্তমান জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল জনাব ডা. শফিকুর রাহমান (তিনি তখন কোন দায়িত্বে ছিলেন, জামায়াতে ছিলেন না শিবিরে ছিলেন, তা আমার জানা ছিল না)। ছিলেন মৌলভী বাজার জেলা জামায়াতের আমীর সিরাজুল ইসলাম মতলিব এবং সিলেট জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক ফজলুর রাহমান।

বিনা অনুমতিতে প্রোগ্রামে হাজির হয়ে হাসি মুখে নিজাম ভাই সহ সকলের সাথে মুসাফাহা করে নিলাম। উনাদের জানান দিলাম “আমি চলে এসেছি”। সন্ধ্যা পূর্ববাসর সাথে সাথে আমি আমার এক সংগীকে সাথে নিয়ে চলে আসলাম-প্রোগ্রাম তখনো চলছিল। প্রোগ্রাম কখন শেষ হয়ে হলো জানিনা। কিন্তু নিজাম ভাইতো আমাকে খোঁজায় ব্যস্ত। খোঁজতে খোঁজতে পেরেশান হয়ে হতাশ মন নিয়ে তিনি যখন বাসায় ফিরলেন, তখন হয়তো আমার ঘুমের এক তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে গেছে।

পরদিন মাদ্রাসায় গিয়ে আবিস্কার করলাম যে, আমি নাকি গতকালও পলাতক শিবির কর্মী ছিলাম। এই বিষয়টা দায়িত্বশীলদের অনেক ভূগিয়েছে বটে। কিন্তু বিষয়টি আমার জীবনে একটা ভাল উপকার করছে। আমি যখন বড় ভাই হয়ে গেলাম, তখন একই ভাবে নিজাম ভাইয়ের ভূমিকা রাখতে ভূলিনি কখনো। সব সময় মনে পড়তো ”আমি এক সময়কার শিবিরের পলাতক কর্মী” । বিধায় পলাতক কর্মী আমার মতো আরো কেউ থাকতে পারে।

শিবিরের পাঁচ দফা কর্মসূচী এবং দক্ষিণ দিকে নামায

 ইতিমধ্যে আমি শিবিরে এগিয়ে চলছি। আমার বাড়ী চান্দগ্রাম এলাকায়। সেখানে একটি মাদ্রাসা আছে। মাদ্রাসাটির নাম সেই সময়ে ছিল “চান্দগ্রাম আনোয়ারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসা”। আমি সেই মাদ্রাসায় দ্বিতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি। এলাকার প্রায় সকল মানুষ মরহুম ফুলতলী সাহেবের ভক্ত। ফুলতলী সাহেবের প্রতিষ্ঠিত আনজুমানে আল ইসলাহ বা আনজুমানে তালামিয়ে ইসলামীয়া তখনও প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। চান্দগ্রাম মাদ্রাসায় পড়ালেখার সুবাদে বা চান্দগ্রামে বাড়ী হওয়ার প্রভাবে আমি আদ্যোপান্ত ফুলতলীর মুরিদ। যখন শিবিরে ভর্তি হয়েছি, তখনো আমি ফুলতলীর মুরিদ। সুজাউল মাদ্রাসায় পড়া অবস্থায় আশে পাশে কোথাও ফুলতলী সাহেবের ওয়াজ মাহফিল আছে, আর আমি যাইনি-এমন কাহিনী খুব একটা নাই। তারাদরম, তালিমপুর, শিমুলিয়া, বিয়ানী বাজার, সুবহানীঘাট ইত্যাদি অনেক মাহফিলে আমি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ফুলতলী সাহেবের উচ্ছিষ্ট খাবার আমি বার কয়েক খেয়েছি বরকতের আশায় বা রোগ মুক্তির প্রত্যাশায়। ফুলতলী সাহেব সম্পর্কে আমি আরেকটি লেখায় লিখার চেষ্টা করতে পারি। ফুলতলী সাহেব তখন শিবিরের বিরুদ্ধে বা জামায়াতের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য দিতেন না। আর সত্য কথা হলো, ফুলতলী সাহেবের মুখে আমি কখনো জামায়াত বা শিবিরের বিরুদ্ধে বক্তব্য কখনো শুনিনি। কারণ, যখন থেকে তিনি এ ধরণের বক্তব্য প্রদান শুরু করেছেন, তার অনেক আগে থেকেই তার মাহফিলে যাওয়া আমি বন্ধ করে দিয়েছে। ফুলতলী সাহেব যেহেতু শিবিরের বিরুদ্ধে কোন কথা বলেন না, সেহেতু চান্দগ্রাম মাদ্রাসাতেও শিবিরের কাজে কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল না। তবে চান্দগ্রাম মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রতি নসিহত ছিল, ছাত্ররা যাতে রাজনীতিতে না জড়ায়। সেই চান্দগ্রাম, আমার নিজের গ্রাম চান্দগ্রাম, আমার জন্মভূমি চান্দগ্রামে একদিন শিবিরের প্রোগ্রাম হলো। জনাব ফয়জুর রহমান জিহাদী সাহেব আমাকে বললেন, আগামীকাল আমরা চান্দগ্রামে যাবো, তুমি সফর সংগী। আমার গ্রামে উনি যাবেন, আর আমি সফর সংগী হতে অপারগতা প্রকাশ করা-কত বড় রখিলী তা তো বুঝারই কথা। সাথে সাথে রাজী হয়ে গেলাম। সে অনুযায়ী পরদিন পায়ে হেটে মুড়াউল হয়ে চান্দগ্রামে পথে যাত্রা গল্লাসাংগনের মাঝ দিয়ে। জনাব ফয়জুর রাহমান পায়ে হাটা এই সময়টাকে সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করে হঠাৎ করে আমাকে প্রশ্ন করলেনঃ দেখি বলতো, শিবিরের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি? আমি বলতে পারলাম না। বললেন, বলতোঃ শিবিরের ৫দফা কর্মসূচী কি কি? আমি বলতে ব্যর্থ হলাম। তিনি আমাকে বললেন, আমার সাথে সাথে বলো। আমি উনার সাথে সাথে বলতে বলতে চান্দগ্রাম পৌছা পর্যন্ত আমি শিবিরের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং ০৫ দফা কর্মসূচী মুখস্ত করে ফেললাম। আমি জনাব ফয়জুর রহমান সাহেবের কাছে বিভিন্ন ভাবে কৃতজ্ঞ-তার একটি হলো, তিনি আমাকে এই বিষয়টি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পন্থায় খুব কম সময়ে মুখস্ত করিয়ে ছাড়লেন। আমি জানিনা এখন আমার কাছে তা কন্ঠস্ত আছে কি না। আমি এ পর্যায়ে সেই মুখস্ত করা বিষয়গুলো পত্রস্ত করবো এই উদ্দেশ্যে যে শিবিরের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং ৫ দফা কর্মসূচী যাদের মুখস্ত আছে বা শিবিরের সংবিধান যাদের হাতের কাছে রয়েছে, তারা মিলিয়ে দেখবেন যে, ফয়জুর রহমান জিহাদী সাহেবের সেই চেষ্টার বরকত কত বছর পর্যন্ত গড়িয়েছে। শিবিরের লক্ষ্য উদ্দেশ্যঃ আল্লাহ প্রদত্ত রাসূল সা. প্রদর্শিত বিধান অনুযায়ী মানব জীবনের সার্বিক পূণর্বিন্যাস সাধন করে আল্লাহর সন্তুষ অর্জন। শিবিরের ০৫ দফা কর্মসূচীঃ প্রথম দফা-দাওয়াতঃ তরুন ছাত্র সমাজের কাছে ইসলামের আহবান পৌছিয়ে তাদেরকে ইসলামী জ্ঞানার্জন এবং বাস্তব জীবনে ইসলামের পূর্ণ অনুশীলনের দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত করা। দুই-সংগঠনঃ যে সব ছাত্র ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিতে প্রস্তুত, তাদেরকে সংগঠনের অধীনে সংঘবদ্ধ করা। তিন-প্রশিক্ষণঃ এই সংগঠনের অধীনের সংঘবদ্ধ ছাত্রদের ইসলামী জ্ঞান প্রদান এবং আদর্শ চরিত্রবান রূপে গড়ে তুলে জাহেলিয়াতের সমস্ত চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণের যোগ্যতা সম্পন্ন কর্মী হিসাবে গড়ার কার্যকরী ব্যবস্থা করা। চার-শিক্ষা আন্দোলন ও ছাত্র সমস্যাঃ আদর্শ নাগরিক তেরী উদ্দেশ্যে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধনে সংগ্রাম এবং ছাত্র সমাজের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে নেতৃত্ব প্রদান। পাঁচ-বিপ্লবঃ অর্থনৈতিক শোষন, রাজনৈতি নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক গোলামী হতে মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামী বিপ্লব সাধনের সর্বাত্তক প্রচেষ্টা চালানো। এক সময় আমরা চান্দগ্রামে পৌছলাম। কমপক্ষে ৪০/৪৫ জনের প্রোগ্রাম হলো চান্দগ্রাম বাজার মসজিদে। ইতিমধ্যে জনাব ফয়জুর রহমান জিহাদী ফাকি দিয়ে আমি বাড়ীতে গিয়েছি এবং আমার আম্মাকে খাবার রেডি করার জন্য বলে এসেছি। কারণ প্রোগ্রাম যখন শেষ হবে, তখন আছর হয়ে যেতে পারে। খাবারের সময়। আমার গ্রামে ফয়জুর রহমান সাহেব আসলেন আর উপোস যাবো, তাতো হতে পারেনা। আম্মাকে বলেছি, আমাদের মাদ্রাসার সবচেয়ে সেরা ছাত্র যিনি-তিনি আসবেন। আম্মা সেই বিবেচনায় ভাল খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। প্রোগ্রামে প্রচুর লোকের উপস্থিতি দেখে আমি অভিভূত। প্রোগ্রামে সবাই “আমি শিবির করি” দেখে অভিভূত। প্রোগ্রাম শেষে প্রোগ্রামের আয়োজকরা জানালেন, মেহমানের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধারণ খাবার নয়, রীতিমতো বাহারী খাবার আয়োজন। আমি শতবার বললাম, আমার আম্মা খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু যেহেতু আগেই এক বাড়ীতে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাই উনাকে সেখানেই খেতে হলো, আমাকেও সেখানে খেতে হলো। খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল চান্দগ্রামের বাদে কিদুর এলাকায় কুতুব উদ্দিন মেস্তরীর বাড়ীতে বাবুল মিয়ার তত্ত্বাবধানে। ওখানে লজিং থাকতেন শফিকুর রহমান ভাই, সেই সুবাদে এই আয়োজন। খাবার শেষ করে আমরা আমাদের বাড়ীতে আসলাম। সেখানেই ঘটনাটা দূর্ঘটনায় রূপ নিল। আমার বাড়ীতে পৌছে যখন বললাম, আমরা খেয়ে এসেছি। তখন আম্মা তো অগ্নিশর্মা। কারণ উনি প্রিয় ছেলের সম্মাণের দিকে খেয়াল রেখে সাথে সাথে মুরগী জবাই করেছেন। ভাল খাবারের আয়োজন করেছেন। কিন্তু তখন আর করার কিছু ছিল না। আমি ফয়জুর রহমান সাহেবকে অজুর পানি দিয়ে ভিতরের ঘরে চলে গেলাম নিজে অজু করতে। অজু করে যখন ফিরলাম, তখন দেখি ফয়জুর রাহমান সাহেব নামাযে মুসাল্লাতে। তিনি নামায পড়ছেন। কিন্ত এ কি!!! তিনিতো দক্ষিণ মুখী হয়ে নামায আদায় করছেন। আমি নামায শেষে তাকে প্রশ্ন করলাম, পশ্চিম তো ওদিকে, আপনি এদিকে কেন নামায পড়লেন। তিনি আশ্চর্য, কি বলো নজরুল! পশ্চিম ওদিকে। তিনি বাহিরে বের হলেন, দিকটা ভাল ভাবে দেখলেন, সূর্যটাকেও ভালভাবে দেখে নিলেন। এর পর আবার পশ্চিমমুখী হয়ে আবার আছরের নামায আদায় করলেন। ততক্ষণে চা রেডি হয়ে গেছে। দুধ চা নয়। সে সময়ে আমাদের বাড়ীতে দুধের গাভী ছিলনা। এখনকার সময়ের গুড়ো দুধ তখনকার সময়ে সহজলভ্য ছিলনা। সেই সময়ে বাড়ীতে গুড়োদুধ রাখার মতো আর্থিক সামর্থ আমাদের ছিলনা। লাল চা আর মুড়ি দিয়ে আপ্যায়িত হয়ে ফয়জুর রহমান জিহাদী সাহেব এবং আমি ফিরলাম সুজাউলের পথে। পথে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্য আর পাঁচ দফা কর্মসূচীর রিভিশন। দেখা গেলো, আমি পুরোটাই বলতে পারছি। সেই যে বলা শুরু হলো। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তা কতবার বলেছি, তার হিসাব নাই। এখনো মনের মাঝে বাজে সেই সুর….তরুন ছাত্র সমাজের কাছে ইসলামের আহবান……………।

আমি শিবিরের মুড়াউল আবাসিক শাখার সহকারী প্রচার সম্পাদক

১৯৮৪ সালের কথা। তখন কি আমার এই বুঝ ছিল যে, শিবিরের সহকারী প্রচার সম্পদক বিষয়টা কি? তাও যদি হয় একটি আবাসিক উপশাখার প্রচার সম্পাদক, তাহলে কতটুকু বিশাল পদ আর দায়িত্ব তাতো বড়রা বুঝার কথা। কিন্তু সেই সময়ে আমি যেহেতু শিবির নামক বিষয়টাই কিছুই বুঝিনি, সেখানে সেই সংগঠনের দায়িত্ব, দায়িত্বের পরিধি, মর্যাদা অথবা সেই আবাসিক উপশাখার সহকারী প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব কি তাতো বুঝার কথা না। কিন্তু আমি বুঝি বা না বুঝি, আমি হয়ে গেলাম সহকার প্রচার সম্পাদক-একটি গ্রামের একটি আবাসিক উপশাখার প্রচার সম্পাদক।

আমি তখনকার সময়ে শিবিরে যোগদান করেছি কেবল এই চিন্তা থেকে যে, শিবির হলো প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রদের একটি প্লাটফর্ম-একটি মিলনমেলা-সেই বিবেচনা থেকে।

সেই সময়ে একটা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংখ্যাই বা কত ছিল? সেই সময়ে মুড়াউল হাই স্কুল শুরু হয়নি বা এই মাত্র শুরু হয়েছে এমন। পুরো এলাকাতে ৬ষ্ট শ্রেণীর উপরে পড়ালেখা করা ছাত্র সংখ্যা হাতে গুনা। তখন বড়লেখা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, হয়নি পার্শবর্তী গল্লাসাংগন মাদ্রাসার কার্যক্রমও।

এমন অবস্থায় হঠাৎ একদিন দাওয়াত পেলাম মুড়াউল বাজার মসজিদে বাদ আসর হাজির হওয়ার। সংগঠনের প্রোগ্রাম আছে। যথারীতি প্রোগ্রামে হাজির হলাম এবং সবার আগেই হাজির হলাম।

টিনের ছাউনি, টিনের বেড়া-এই নিয়ে মুড়াউল বাজার মসজিদ। এই মুহুর্তে মনে করা খুবই কঠিন যে সেই প্রোগ্রামে কে কে উপস্থিত ছিলেন। তবে এতো টুকু মনে আছে যে, আমি সাংঘাতিক ধরণের পুলকিত হয়ে সন্ধ্যার পর যখন বাসায় পৌছলাম, তখন আমি একটি বিশেষ খাতা তৈরী করলাম আর সেই খাতার কাভার পেজে লিখলাম “মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সহকারী প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, মুড়াউল আবাসিক উপশাখা”।

সময়ের সাথে ব্যস্ততা ইত্যাদি মিলিয়ে চলে গেলো অনেক দিন। মুড়াউল উপশাখার কোন প্রোগ্রামে কেউ কোন দিন আমাকে দাওয়াত দেয়নি। তাই মুড়াউল উপশাখার আর কোন প্রোগ্রামে আমার উপস্থিত হওয়া হয়নি। এরই মাঝে আমার আবাস স্থল পরিবর্তন হয়ে গেলো। মুড়াউল উপশাখা ইনতেকাল করলো বা বেঁচে থাকলো, সেই খবর আমার কাছে থাকলো না। আর এ ধরণের খবর নেয়ার মতো দায়িত্বানুভূতি আমার মানসিকতায় তখনো সৃষ্টি হয়নি।

এরই মাঝে বিদায়ের সুর বেজে উঠলো আমাদের অংগনে। দাখিলের নির্বাচনী পরীক্ষা দিয়ে আমরা চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয়ার জন্য মাদ্রাসা ছাড়া হয়ে গেলাম। শিবির নামক বস্তুটা ধামাচাপা দিয়ে দেয়া হলো জীবনের এই পৃষ্ঠা থেকে। সাথে সাথে বিলিন হয়ে গেলো সহকারী প্রচার সম্পাদকের পদবীও।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, আমি শিবিরে ভর্তি হয়েছি শিবিরের আদর্শ দেখে বা বুঝে নয়, বরং শিবিরে একদন মেধাবী ছাত্রের সমাবেশ দেখে। আর আমি যেহেতু ফূলতলী সাহেবের মুরিদ, সেহেতু শিবির করার সাথে সাথে ফুলতলী সাহেবের ওয়াজ মাহফিলে উপস্থিত হওয়ার রীতি অব্যাহত থাকলো। মুড়াউল এলাকায় আমি যখন লজিং ছিলাম, তখন পশ্চিমের বাড়ীতে থাকতেন তালিমপুরের শহীদ। আমার ক্লাশমিট আব্দুল মালিক ভাইয়ের ছোট ভাই। বয়স এবং সাইজের দিক দিয়ে আমি আমার ক্লাশের সকল ছাত্রের চেয়ে তুলনামুলক ছোট থাকার কারণে আমার ক্লাশের ছাত্রদের সাথে ক্লাশের বাহিরে আমার খুব যোগাযোগ ছিলনা। ফাস্টবয় হিসাবে জিয়াউর রহমানের সাথে পড়ালেখার আদান প্রদানের একটি স্বার্থবাদী সম্পর্ক ছিল মাত্র। একই কারণে শহীদ এর সাথে আমার সুগভীর সম্পর্ক ছিল। বড়লেখার ব্যবসায়ী জাহিদ চাচার ছেলে আব্দুল মালিক ও আব্দুশ শহীদ। সম্পর্কের সুবাদে শহীদের বাড়ী এবং মামার বাড়ী পর্যন্ত আমার যাতায়াত ছিল। শহীদের মামা বড়খলা দারুল উলুম মাদ্রাসার মুহতামীম (নাম মনে নেই), যেখানে গেলে আমি মিলাদ কিয়ামের বিরুদ্ধে দীর্ঘ বক্তব্য শুনতাম। মুহতামীম সাহেবের এক আত্মীয় আমারই নামে নাম মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম-যিনি এখন বড় মাওলানা, যিনি দেখা হলে এখনো আমাকে মাখরাজের সাথে চাচাজি ডাকেন। আর তালিমপুর বাড়ী হওয়ার কারণে সেখানে গেলে চান্দগ্রামের একটা স্বাদ পাওয়া যেতো বলে সব সময়ই তালিমপুর যাওয়া হতো। তালিমপুরে ফুলতলী সাহেবের ওয়াজ খুব একটা বাদ পড়েনি আমার কখনো। আর এই সব ওয়াজ মাহফিলে উপস্থিত থাকার সুবাদে আমি আকীদা বিশ্বাসে একদম খাটি ফুলতলী পন্থী ছিলাম। অপর দিকে সুজাউল মাদ্রাসায় পড়ার সুবাদে আমি শিবিরের একজন বলিষ্ট নেতা “আবাসিক উপশাখার সহকারী প্রচার সম্পাদক” হলাম।

আমি বা আমরা শিবির থেকে নিজেকে গায়েব করে নিলেও দায়িত্বশীলদের মন থেকে আমরা দূরে সরে যাইনি। তার প্রমাণ পেলাম যে দিন আমরা দোয়া নিতে আসলাম সুজাউল মাদ্রাসায় পরীক্ষার মাত্র ক’দিন আগে। দেখলাম নিজাম ভাই, গৌছ ভাই, ইসলাম ভাই, উসমান ভাই সহ সবাই উপস্থিত আছেন আমাদের বিদায় দিতে এবং দোয়া দিতে। বড় ভাই এবং উস্তাদদের দোয়া নিয়ে আমরা উপস্থিত হলাম পরীক্ষা কেন্দ্রে।

দাখিল পরীক্ষার সময় আমরা থাকলাম চৌমূহনাতে একটা হোটেলে। জিয়া ভাই, আব্দুল মালিক ভাই মারহুম, আকমল ভাই এবং শামসু ভাই গংরা থাকতাম।

আমাদের পরীক্ষার হল তদানিন্তন মৌলভী বাজার টাউন সিনিয়র মাদ্রাসায়। যা পশ্চিম বাজার মসজিদের দক্ষিণে ছিল, যেখানে আমি ফাজিল পড়েছি। মাদ্রাসাটি এখন স্থান বদল করে শাহ মোস্তফা রোডে চলে এসেছে।

পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে মৌলভী বাজারের শিবিরের নিতৃবৃন্দ আমাদের সাথে পরিচিত হতেন। পরীক্ষার শেষ নিয়ে মৌলভী বাজারের পশ্চিম বাজার মসজিদে সকল পরীক্ষার্থীদের নিয়ে সংবর্ধনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে আমাদেরকে প্রচুর সম্মান প্রদান করা হয় এবং নাস্তারও ব্যবস্থা করা হয়। জিয়া ভাই আমাকে সেই প্রোগ্রামের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, হেই নজরুল-খানিও আছে।

সেই সংবর্ধনা সভা শিবিরের সেই সময়ের শেষ অনুষ্ঠান। আলিম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত শিবিরের আর কোন প্রোগ্রামে উপস্থিত হইনি। সহকারী প্রচার সম্পাদকে দায়িত্ব এভাবেই সমাপ্ত করলাম।

চান্দগ্রাম মাদ্রাসায় শিবিরের কার্যক্রম

১৯৮৫ সালের মাঝামাঝি সময়। সুজাউল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করে আলিম ক্লাশে ভর্তি হওয়ার পালা। সুজাউল মাদ্রাসা থেকে কমপক্ষে ৮০জন ছাত্র একসাথে মাদ্রাসা ছেড়ে চলে গেছেন। ভর্তি হয়েছেন দক্ষিণভাগের গাংকুল মাদ্রাসায়। আমি যাদেরকে দেখে ছাত্রশিবিরে ভর্তি হয়েছি, তাদের অন্যতম জনাব ফয়জুর রাহমান জিহাদী এখন গাংকুল মাদ্রাসার আরবী প্রভাষক, হাফেজ নিজাম উদ্দিন ফাজেল শ্রেণীর ছাত্র, জনাব গৌছ উদ্দিন আলিম শ্রেণীর ছাত্র। ফয়জুর রহমান সাহেব ইতিমধ্যে কামিল পাশ করে চাকুরী নিয়েছেন গাংকুল মাদ্রাসায়। জনাব হাফেজ নিজাম বড়লেখা থানা শিবিরের সভাপতি আর গৌছ উদ্দিন সেক্রেটারী। তাদের সহকারী হিসাবে আছেন জনাব উসমান আলী ভাই এবং ইসলাম উদ্দিন ভাই। আছেন আমার ক্লাশমিট আকমল ভাইও । তিনি ইতিমধ্যে গাংকুল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে গেছেন। আমি গাংকুল মাদ্রাসায় ভর্তি হবো। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাড়ালেন আমার আব্বা। তিনি তখন চান্দগ্রাম আনোয়ারুল উলুম মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সদস্য।
চান্দগ্রাম মাদ্রাসায় এ বছর আলিম শ্রেণীর ক্লাশ শুরু হবে। বিধায় গ্রামের সকল ছাত্রকে এখানে ভর্তি হতে হবে। সেই সুবাদে আমাকেও বাধ্য হয়ে এখানে ভর্তি হয়ে গাংকুল মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করতে হলো।
চান্দগ্রাম মাদ্রাসায় ভর্তি হলেও মন সব সময় গাংকুল মাদ্রাসায়। এমন অবস্থায় শিবিরের একদল দায়িত্বশীল আসলেন চান্দগ্রামে। তাদের মধ্যে মাত্র ১জনের নাম আমার মনে আছে। তিনি জনাব উসমান আলী ভাই। লম্বা মানুষটা সব সময় আমাকে ভালবাসেন, এখনো সেই ছোট্টকালের মতো ভালবাসেন। তিনি আমার সাথে চান্দগ্রাম বাজার মসজিদে বসে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন। এখন আমি বুঝি যে, তিনি আমার সাথে কন্টাক্ট করেছিলেন এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাকে সাথী করার জন্য তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল-আমি ছিলাম তার সাথী টার্গেট।
উনার বক্তব্য ছিলঃ
১. শপথ বিহীন মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু। অতএব নামায রোযা করে ইসলামী আন্দোলনে সময় দিয়ে জাহেলিয়াতের মৃত্যু কাম্য নয়।
২. নিজের আমল আর পড়ালেখা ঠিক রাখার জন্য একজন অভিভাবক দরকার। সংগঠন সেই অভিভাবক হবে তাদের জন্য, যারা সংগঠনের আনুগত্য করার শপথ নেবেন।
৩. সংগঠনের অনেক বিষয় আছে আমরা জানিনা, তা জানতে হলে সাথী হতে হবে।
৪. সিনেমা দেখা বাদ দিতে হবে।
৫. পরীক্ষায় নকল করার চিন্তা বাদ দিয়ে পড়ালেখা করে পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। আর এজন্য নিজ জীবনকে একটি নিয়মের অধীনে নিয়ে আসতে হবে। আর এজন্য সাথী শপথের বিকল্প নাই।
জনাব উসমান ভাই মনোরম ডিজাউনের একটি রিপোর্ট বই আমাকে প্রদান করলেন এবং রিপোর্ট রাখার গুরুত্ব ও ফজিলত এবং নিয়মাবলী ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, এখন তোমার কর্মক্ষেত্র হলো চান্দগ্রাম। তাই আমিও চান্দগ্রাম কেন্দ্রীক শিবিরের কার্যক্রম শুরু করলাম।

চান্দগ্রামে ১০ হাজারী পীরের মাজার সংলগ্ন মসজিদ তথা সরাজের বাড়ীর মসজিদ আর চান্দগ্রাম বাজার মসজিদ কেন্দ্রীক আমাদের কার্যক্রম শুরু হলো। আমি চান্দগ্রাম মাদ্রাসা শাখা শিবিরের সভাপতি।
মাত্র কয়েক দিনের প্রচেষ্টায় চান্দগ্রাম এলাকায় শিবিরের কাজ জমে উঠলো। প্রতিদিন বিকালে চান্দগ্রাম জামে মসজিদের মাঠে জমে উঠতো আডডা। এমনই ভাবে শিবিরকে নিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি।
তখনকার সময়ে ছাত্রদের আমরা কি বুঝাতাম, তা এই ক্ষণে একটুও মনে পড়ছেনা। কিন্তু চান্দগ্রামে শিবির করতে এসে হঠাৎ আমার মনে হলো, আমি আমার বাবার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে চলছি। বিষয়টা ছিল এভাবে,
আমার বাবা সব সময় ফুলতলী মসলকের উলামায়ে কিরামদের ভাল চোঁখে দেখতেন না। উনার বক্তব্য অনুযায়ী “ওদের ইলিম কম”। তিনি সব সময় বরুনী, হাজিপুরী গ্রুপের উলামায়ে কিরামদের সাথে সম্পর্ক রেখে চলতেন। তারই প্রচেষ্ঠায় একবার চান্দগ্রাম আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে উপস্থিত হয়েছিল বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মাওলানা এমদাদুল হক ফরিদপুরী। তিনি ব্যক্তিগত ভাবে চাইতেছিলেন যেন আমি ফুলতলী মসলকের না হই।
১৯৭৮ সালে আমি যখন চতূর্থ শ্রেণীতে পড়ি তখন ফুলতলী সাহেব মারাত্মক আহত হয়েছিলেন হবিগঞ্জের সঈদপুরে। তিনির সাথে আহত হয়েছিলেন তার সেক্রেটারী জনাব আলতাফ (যাকে আমি আমার পুরো জীবন ফুলতলী সাহেবের খেদমত করতে দেখেছি এবং সব সময়ই তিনি ফুলতলী সাহেবের সুপারী কোটার দায়িত্বে ছিলেন) এবং কোনাগ্রামের গিয়াস কারী সাহেব। ফুলতলী সাহেবের আহত হবার খরব শুনে ফুঁসে উঠে চান্দগ্রাম। বের হয় মিছিল। আমি সেই মিছিলের একজন সহযাত্রী ছিলাম্ পায়ে হেটে মিছিল নিয়ে বড়লেখায় এসেছি। আবার সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশ শেষ করে পায়ে হেটে তদানিন্তন সময়ে জয়াললিন এলাকা বলে পরিচিত সুড়িকান্দির মাঝ দিয়ে মিছিল করতে বাড়ীতে এসেছি। তখনকার সময়ের শ্লোগান ছিলঃ হৈ হৈ রৈ রৈ-জোয়াইল্লার পাঠা গেলো কই, ইসলামের শত্রুরা – হুশিয়ার সাবধান ইত্যাদি। মিছিল শেষ করে বাড়ীতে এসে আব্বার হাতের মার খেয়ে আব্বাকে ইসলামের বড় ধরণের শত্রু মনে করে পরের দিনে আবার বিয়ানী বাজারে গিয়েছি মিছিল নিয়ে। পরদিন সিলেটের রেজিস্টারী মাঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ধরা খেয়ে বাড়ীতে ফিরে আসি।
আমি একদিন বাড়ীতে আগর গাছের ডাল দিয়ে তৈরী মিসওয়াক দিয়ে মিসওয়াক করছি। আব্বা বললেন, তুমি তো জোয়াল্লিন হয়ে গেছো। আমি বললাম, কিভাবে? তিনি বললেনঃ জোয়াল্লিনেরা মিসওয়াক করে। চান্দগ্রাম মাদ্রাসার পড়ার সময় দেখলাম, যখনই আমি শিবিরের কার্যক্রম শুরু করলাম, তখন আমি পুরো জোয়াল্লিন হয়ে গেলাম। এ ব্যাপারে একটি ঘটনা আছে, যা উল্লেখ করবো পরবর্তী পর্বে। সে পর্বে থাকবে জালাল সিদ্দিকী সাহেবের সাথে একটি বিতর্কের বিস্তারিত।

ডাক্তার আমিনুল ইসলাম মুকুলের সমাবেশ ও জালাল সিদ্দিকী

জনাব আমিনুল ইসলামের সমাবেশে তথা ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড়লেখার সমাবেশে চান্দগ্রাম মাদ্রাসার সকল ছাত্র অংশ গ্রহণ করার প্রেক্ষিতে গতকাল অষ্টম শ্রেণীতে ক্লাশ না হওয়ায় সকল ছাত্রকে ছুটির পর জালাল সিদ্দিকী সাহেব তলব করেছেন-মাদ্রাসা ছুটির পর সকল ছাত্র যেন মাদ্রাসা অফিসে হাজির হোন। পূর্বেই বলেছি আজ আমি মাদ্রাসায় যাইনি। ঐ দিন মাদ্রাসা ছুটির সময় আমি অলৌকিক ভাবে মাদ্রাসায় হাজির হলাম। তখন মাদ্রাসার অফিস ছিল মসজিদের পুকুর পাড়ে বর্তমান মসজিদের উত্তর পাশে। আমি পুকুর পাড় থেকে মাদ্রাসার দিকে যাচ্ছি। তখনই দরজা দিয়ে মাদ্রাসা অফিসে দন্ডয়মান সকল ছাত্রদের দেখতে পেলাম। আমার মন চাত করে উঠলো। এরাতো সবাই, যারা গতকাল শিবিরের সমাবেশে গিয়েছিলো। আমি কোন ধরণের অনুমতি না নিলে সরাসরি গিয়ে হাজির হলাম মাদ্রাসা অফিসে। ঢুকেই মুহতারাম জালাল সিদ্দিকী সাহেবকে সালাম দিলাম। দেখলাম সকল ছাত্র দাড়িয়ে আছে, কারো মুখে কোন কথা নাই। তিনি প্রশ্ন করছেন, তোমরা কাল কেন মাদ্রাসায় আসলানা। কেন তোমরা শিবিরের মিটিং এ গেলা। ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।
জনাব জালাল সিদ্দিকী সাহেবকে অবাক করে দিয়ে আমি আলোচনায় অংশ নিলাম। বললাম, হুজুর! আপনি উনাদেরকে অহেতুক প্রশ্ন করছেন। আপনি এ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল নন। আপনাকে এই মাদ্রাসায় আনা হয়েছে আমাদেরকে পড়ানোর জন্য। আপনি এসব উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করছেন কেন?
জনাব জালাল সিদ্দিকী সাহেব অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। তাকে তার স্বাভাবিক কথাবর্তা বিঘ্নিত হলো। আর আমিও চাচ্ছিলাম তিনি যাতে রাগান্মিত হোন। আমার ঔষধে কাজ দিল। তিনি বিষম রাগান্মিত হয়ে বললেন, ”আমরা চাইনা আমরা ছাত্রদের পড়াই, আর তারা বড় হয়ে আমাদেরকে কাফির ফতোয়া দিক।”
আমি বললাম, আপনি যদি কুফুরী করেন, তাহলে আপনার ছাত্রদের তো সৎ সাহস থাকা উচিত যে, আপনাকেও কাফের ফতোয়া দিতে আপনার মুখের দিকে থাকাবেনা। আমি দোয়া করি আপনি সব সময় হেদায়াতের উপর থাকেন।
এর পর জালাল সিদ্দিকী সাহেব উল্টা পাল্টা অনেক ধরণের কথা বললেন। আমি তাকে শুধু বললাম, দেখেনঃ ক্লাশ শেষ হয়েছে। আপনি আপনি ছাত্রদেরকে অনুমোদনহীন ভাবে আটকিয়ে রেখেছেন। আপনি মনে রাখা দরকার এমাদ্রাসার আপনি প্রিন্সিপাল নন। আর প্রিন্সিপালেরও সাহস নাই ছাত্রদের এই ভাবে আটকিয়ে রেখে প্রশ্ন করার। পড়ালেখার যদি কিছু থাকে, তাহলে কালকে ক্লাশে গিয়ে প্রশ্ন করবেন। আপনি নিশ্চয়ই রাজনীতি করার জন্য চান্দগ্রামে আসেননি, আর চান্দগ্রামের মানুষও আপনাকে রাজনীতি করার জন্য চান্দগ্রামে আনেনি। যদি পড়ালেখা ছাড়া অন্য কোন বিষয় আপনার এজেন্ডা থাকে, তাহলে গ্রামবাসীদের কাছে তা পরিস্কার করবেন। একথা বলেই আমি সব ছাত্রদের নির্দেশ দিলাম, তোমরা চলে যাও। আর উনাকে বললাম, যত ধরণের প্রশ্ন আছে আপনি আমাকে করতে পারেন।
আমরা চলে যাওয়ার ইংগিতে সকল ছাত্র হুড়হুড় করে মাদ্রাসা অফিস ত্যাগ করলো। মুহতারাম জালাল সিদ্দিকী সাহেবও রাগে দূঃখে অগ্নি শর্মা হয়ে মাদ্রাসা ত্যাগ করলেন। এর পর যতদিন অবধি মাদ্রাসায় আলেম ক্লাশ চলেছে, উনাকে মাদ্রাসার সীমানায় দেখিনি।
ক’দিন পরের ঘটনা। বাড়ীতে গিয়ে দেখি আব্বা অগ্নিশর্মা হয়ে আছেন। আমি নাকি উস্তাদের সামনে বেয়াদবী করেছি। জালাল সিদ্দিকী যে কারণে চান্দগ্রামে আসছেন না। আমি আমার আব্বাকে বললামঃ আপনি আপনার ছেলেকে কখনো কোন দিন বেয়াদবী শিখাননি। তবে আপনি আপনার ছেলেকে যত বড় সমস্যাই থাকুক, উচিত কথা বলতে নসিহত করেছেন। আপনি আপনার ছেলেকে লিল্লা খাইতে নিষেধ করেছেন-কারণ লিল্লা খাইলে নাকি উচিত কথা বলা যায়না। আমি আপনার ছেলে হিসাবে দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, আজ অবধি আমি কোন লিল্লা খাইনি। বিধায় আমি উচিত কথা বলেছি। আর সেই উচিত কথা যদি হয় বেয়াদবী, তাহলে আমি সেই বেয়াদবী করেছি।
আব্বা সেই উচিত কথাটা কি তার সন্ধানে বেরিয়ে গেলেন। আর কখনো উনি উচিত কথার ব্যাপারে আমাকে কোন প্রশ্ন করেননি। সময়ের ব্যবধানে সেই উচিত কথার সন্ধান করতে করতে আমার আব্বা এক সময়ে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করলেন। সে ইতিহাস আমরা আরেকদিন আলোচনা করবো।
আজোঁ কানে বাঁজে সেই আমিনুল ইসলাম মুকুলের বক্তৃতার ঝংকার, বাঁজে পানজেরীর কুম মুসলিমান সুর। সাথে মনে জাগে জালাল সিদ্দিকীর সেই বিরুধীতা। আর আমাদের সামনে চলার গান। বাঁধার প্রাচীল সব ভাংগবোই, মুক্তির সূর্যটা আনবোই।

কামাল উদ্দিন জাফরী মুখস্ত করা ওয়াজ ভুলে যাওয়াতে দ্বিতীয় ওয়াজ শুরু করে তাও ভূলে গেলেন

সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রায় ৮০ জন ছাত্র ইতিমধ্যে গাংকুল মাদ্রাসায় গিয়ে ভর্তি হয়েছেন। আমিও সেখানে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার আব্বা জনাব আব্দুল ওয়াহিদ গ্রাম সরকার চান্দগ্রাম আনোয়ারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হওয়াতে বাধ্য হলাম চান্দগ্রাম মাদ্রাসায় নতুন শুরু হওয়া আলিম শ্রেণীতে ভর্তি হতে।

ইতিপূর্বে সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসায় ৩ বছর অধ্যয়নের ফলে সেখানকার শিক্ষা প্রদান পদ্ধতি এবং সেখানকার শিক্ষকদের দৈনন্দিন পাঠ প্রস্তুতি সম্পর্কে একটা ভাললাগা তৈরী হয়েছিল। সুজাউল মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রায় সবাই জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক হলেও একজনও সক্রিয় ছিলেন না বা কর্মী বা রুকন ছিলেন না। তাদের সকলের একটাই নেশা ছিল-ছাত্রদের পাঠ বুঝিয়ে দেয়া। তারা রীতিমতো আগামী দিনের ক্লাশের বিষয়বস্তু পূর্বরাতে পড়াশুনা করে আসতেন এবং ছাত্রদের পক্ষ থেকে আসা সম্ভাব্য সকল প্রশ্নের উত্তর রেডি করে আসতেন। সুজাউল আলিয়া মাদ্রাসায় ক্লাশের শেষ পর্যায়ে ছাত্রদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা এক ধরণের বাধ্যতামূলক রেওয়াজ ছিল। যার কারণে ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে একটি ঈর্ষনীয় বন্ধন ছিল।

চান্দগ্রাম মাদ্রাসায় এসে এই বিষয়টা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত পেলেও সুজাউল মাদ্রাসার অভ্যাসে আমি ছিলাম অভ্যস্ত। ছাত্র জীবনে খুব মেধাবী ছাত্র কখনোই ছিলাম না। সব সময় রুল নম্বর ৩ অথবা ৪ থাকতো। তবে আমার হাতের লেখা যে খুব সুন্দর এটা ছাত্র জীবন কর্মজীবন এমন কি শশুরবাড়ীর তরফ থেকেও বারবার শুনার পর প্রবাসী জীবনেও হাজার বার শুনেছি।

চান্দগ্রাম মাদ্রাসার শিক্ষক যারা আলিম শ্রেণীতে পড়াতেন, তাদের মাঝে কেবলমাত্র মাওলানা ফয়জুর রাহমান মুড়াউলী হুজুর এবং মাওলানা মকবুল হোসাঈন বাহাদুরপুরী ছাড়া আর কেহই এই শ্রেণীতে পড়ানোর মতো যোগ্যতা ছিলনা। পূর্বে যে জালাল সিদ্দিকী সাহেবের কথা উল্লেখ করেছি (তিনি নাকি এখন আমেরিকাতে একটা মসজিদের ইমাম) সেই জালাল সিদ্দিকী সাহেব ওয়াজে যতই এক্সপার্ট হোন না কেন, বাস্তব জীবনে কিতাবী ইলিমে অত্যন্ত দূর্বল ছিলেন। ক্লাশে ওয়াজ নসিহত করে সময় পার করার চেষ্টাতে আমি যখন বাঁধা হয়ে গেলাম, কখন প্রায় সকল শিক্ষকই মন থেকে চাচ্ছিলেন আলিম ক্লাশটা যেন বন্ধ হয়ে যায়। আমার সহপাটি যারা ছিলেন, তাদের মাঝে চান্দগ্রামের আশরাফ আলী ব্যক্তিগত জীবনে খুবই মেধাবী ছিলেন। আর তারাদরমের ফখরুল ইসলাম মামু-যিনি খুব ভাল ছাত্র ছিলেন না। তারা কেহই কথা বলে উস্তাদের বিরাগবাজন হওয়া বা বিয়াদব ডিগ্রী নেয়ার পক্ষপাতি ছিলেন না।

অবশেষে এক সময়ে চান্দগ্রাম মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণীর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আমি ভর্তি হই পাথারিয়া গাংকুল মনসুরিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায়। গাংকুল মাদ্রাসাতে আমার জীবনে মাত্র ২দিন যাওয়া হয়েছিল। সবশেষে যে দিন গিয়েছিলাম, সেদিন ছিলাম আমি সুজাউল মাদ্রাসার ছাত্র। সুজাউল মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস পদে চাকুরী করতেন জনাব মাওলানা আব্দুশ শাকুর। আর তিনি লজিং থাকতেন মুড়াউল এলাকাতে। আর আমিও লজিং থাকতাম মুড়াউল এলাকাতে। আমি নিম্ন ক্লাশের ছাত্র হওয়াতে উনি আমাদেরকে কোন ক্লাশ নিতেন না। কিন্তু এক এলাকায় লজিং থাকার কারণে উনার আদর ভালবাসা পেতাম সীমাহীন। ব্যক্তিগত ভাবে তিনি আমাকে ”লংকা পুড়া” বলে ডাকতেন। উল্লেখ্য যে, সিলেট এলাকায় লংকাপুড়া নামে একটি ছোট্ট মরিচ আছে, যা খুবই ঝাল। সেই মাওলানা আব্দুশ শাকুর সাহেব গাংকুল মাদ্রাসায় প্রিন্সিপালের চাকুরী নিলেন। তাকে গাংকুল পর্যন্ত পৌছাতে অনেক ছাত্রের সাথে আমিও লাতুর ট্রেনে সওয়ার হয়ে গাংকুল মাদ্রাসায় হাজির হয়েছিলাম। এখনো মনে আছে, যারা তাকে গাংকুল পৌছিয়ে দিয়ে ছিলাম, তাদেরকে তিনি নাস্তা করার জন্য টাকা দিয়েছিলন। যা দিয়ে আমরা ফিরতি ট্রেনে মুড়াউল নেমে মুড়াউল বাজারে জনাব আজির উদ্দিনের হোটেলে ব্রেড (তদানিন্তন সময়ের লুফ) ও দুধ দিয়ে নাস্তা করেছিলাম। সে সময়ে লুফ প্লেটে নিয়ে তার উপর চিনি দিয়ে তা দুধ দিয়ে বিজিয়ে চামচ দিয়ে কেটে কেটে খাওয়া সাংঘাতিক মজাদার নাস্তা ছিল।

প্রথমবার আমি গাংকুল মাদ্রাসায় যখন যাই, তখন আমি গাংকুল নামক জায়গাটার সাথে নতুন পরিচিত। মূলতঃ তখন আমি চান্দগ্রাম মাদ্রাসার ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র। আমি মাদ্রাসা থেকে চলে আসি বিয়ানী বাজারের পাতন এলাকায় ওয়াজ মাহফিলে যাওয়ার জন্য। সেখানে জনাব ফুলতলী সাহেব প্রধান অতিথি হিসাব আসার কথা। তখনকার মন চাচ্ছিল ওয়াজ মাহফিলে হাজির হয়ে ফূলতলী সাহেবের সামনে রুমাল ধরে তাওবা করবো।

বাড়ীতে আসার পর আমার আব্বা বললেন, তিনিও নাকি ওয়াজে যাবেন। তাই উনার সাথে যাওয়াই শ্রেয় মনে করলাম। কারণ আব্বার সাথে গেলে ওয়াজ মাহফিলে আসা ভাল ভাল খাবার পাওয়া যাবে। আব্বার সাথে চান্দগ্রাম বাজারে এসে বাসে উঠলাম। বাসে বলতে সাধারণ বাসে নয়, একদম ড্রাইভারের পাশের সিটে। সেই সময়ে বাসে আপার-লয়ার, সাধারণ ইত্যাদি সিট ছিল। ড্রাইভিং সিটে বসা আমার জীবনে এটাই প্রথম। মনে কত আনন্দ। কোথায় ওয়াজ। মনে হচ্ছিল, সারা দিন যেন বাসের মধ্যে থাকি। বাস চলা শুরু করলো। বাস পাতন এলাকায় না গিয়ে পৌছলো বড়লেখা হয়ে রতুলীতে। সেখানে গাংকুল মাদ্রাসা। সেই মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা নজাবত আলী। সেখানের ওয়াজ মাহফিলের আজকের প্রধান অতিথি জনাব মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী।

চতূর্থ শ্রেণীর ছাত্র হিসাবে কামাল উদ্দিন জাফরীর নাম কখনো শুনিনি। আমাদের শুনা বড় বড় মাওলানা বলতে তখন ছিলেন, জনাব আব্দুল লতিফ ফুলতলী, হাবীবুর রাহমান ইছামতি, ক্বারী গিয়াস উদ্দিন কোনাগ্রামী, রমিজ উদ্দিন ভোট্রো, আব্দুল কুদ্দুস নুরী গং। কামাল উদ্দিন জাফরী গাংকুল মাদ্রাসায় আসার ব্যাপারে একটি বিরাট কাহিনী আছে, যা আমি বড় হয়ে জানতে পারলাম। ওয়াজ মাহফিলে একটা বড় হাঙ্গামা হয়েছিল আমি কেবল এটাই মনে ছিল। কিন্তু কেন হাঙামা হয়েছিল, তা আমার মনে নেই। আমি মনে করতাম যে, কামাল উদ্দিন জাফরীর যে ওয়াজ মুখস্ত করে এসেছিলেন, তা ভূলে যাওয়াতে দ্বিতীয় ওয়াজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই ওয়াজও তার ভাল মুখস্ত ছিল না। আমি দেখলাম জোহরের পর কামাল উদ্দিন জাফরী মঞ্চে উঠলেন, ওয়াজ শুরু করলেন, কিছুক্ষণ পর মুনাজাত করে ফেললেন। এর পর আবার শুরু করলেন। এর পর হাঙামা হলো। আমি বুঝলাম উনি প্রথম ওয়াজটা ভূলে যাওয়ার পর দ্বিতীয় ওয়াজ শুরু করে তাও ভূলে যাওয়াতে উপস্থিতি বিরক্ত হয়ে হাঙামা করেছে। চতূর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া একজন ছাত্র যেমন ভাবার ক্ষমতা রাখে তেমনই ভাবলাম।

বড় হয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানলাম। ঘটনাটা ছিল এমনঃ গাংকুল মাদ্রাসার একজন বড় ডোনার-যার নাম ছাই হাজি বা ছখই হাজি হবে। বড়থল এলাকায় যার বাড়ী। তার এক ছেলে পড়তো নরসিংদী জামেয়া কাসেমীয়াতে। যেই সুবাদে হাজি সাহেব ছিলেন কামাল উদ্দিন জাফরী সাহেবের মুরিদ। তিনি প্রস্তাব করলেন কামাল উদ্দিন জাফরী সাহেবকে যেন গাংকুল মাদ্রাসার বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে মেহমান করা হয়। তদানিন্তন সময়ে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল নজাবত আলী সাহেবসহ প্রায় সকল শিক্ষক ছিলেন অন্য ঘরণার। তারা বিষয়টা না করতে পারছেন না হাজি সাহেব মাদ্রাসার একজন ভাল ডোনার হওয়ার কারণে, আবার রাজী হতে পারছেন না তাদের নিজস্ব প্লাটফর্ম জাফরী সাহেব বিরুধী হওয়ার কারণে। অবশেষে উনারা হাজি সাহেবের প্রস্তাব মেনে নিয়ে তাকে প্রধান অতিথি করতে সম্মত হলেন। কিন্তু উনারা ভিতরে ভিতরে কামাল উদ্দিন জাফরীকে অপদস্ত করার নীল নকশা আঁকলেন। উনাদের নীল নকশা ছিল, উনারা কামাল উদ্দিন জাফরী সাহেবের ওয়াজের ভূল ধরবেন। উনাদের বিবেচনায় ছিল, কামাল উদ্দিন জাফরী সুন্দর ওয়াজ করেন বটে, কিন্তু তিনি ভাল আলেম নন।

নীল নকশা বাস্তবায়নে কামাল উদ্দিন জাফরী সাহেব যখন ওয়াজ শুরু করলেন, তখন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সহ সকল শিক্ষক মঞ্চের পাশে উঁত পেতে থাকলেন, কখন কিভাবে কামাল উদ্দিন জাফরী সাহেবের ভূল ধরা যায়।

গতানুগতিক ধারা অনুযায়ী কামাল উদ্দিন জাফরী সাহেব ওয়াজ শুরু করলেন। কিন্তু উনার নিজস্ব ধারা অনুযায়ী খুতবা শেষ করে সংক্ষিপ্ত দরুদ পাঠ করে আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করতে সংক্ষিপ্ত মুনাজাত করলেন। বিষয়টা উপস্থিত প্রিন্সিপাল ও শিক্ষক মন্ডলীর কাছে কাংখিত ছিল না। আর আমি তখন একজন শিশু শ্রোতা হিসাবে মনে করেছিলাম উনি তার মুখস্ত করা ওয়াজ ভূলে গিয়েছেন বলে মুনাজাত করে দ্বিতীয় ওয়াজ শুরু করেছেন।

এর পর উনি উনার মুল আলোচনা শুরু করলেন। উনি ওয়াজ করছেন কি বিষয়ে, তা কি আমার বুঝার বয়স আছে। পাশে মাদ্রাসার প্রিন্সিপালসহ তার অনুগত শিক্ষক মন্ডলী বসে আছেন, এই বুঝি ভূল করে ফেললেন কামাল উদ্দিন জাফরী-এমন হাবভাব। এক সময় বড়শীতে মাছের চিমটি কাটার খবর মিললো। মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী আরবী একটা শব্দের উল্লেখ করতে গিয়ে যে অর্থ বললেন, উপস্থিত প্রিন্সিপাল ও উঁত পেতে বসে থাকা শিক্ষকদের কাছে তা সঠিক বলে মনে হলনা। তারা সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠলেন। বললেন, মাওলানা সাহেবঃ এই শব্দটার এই অর্থ নয়। একধাপ এগিয়ে তারা মিসবাহুল লুগাত (আরবী ভাষার একটি প্রসিদ্ধ অভিধান) বের করে নিলেন। সাথে সাথে মাহফিলে আনাগোনা আর হাঙামার ভাব লক্ষ করা গেলো। আমি একজন শিশু শ্রেুাতা হিসাবে কিছুই বুঝে উঠলাম না। আমি মনে করলাম, যে কামাল উদ্দিন জাফরী প্রথম ওয়াজটা ভূলে গিয়েছিলেন, তিনি দ্বিতীয় ওয়াজটাও ভূলে গেলেন এইমাত্র। কিন্তু বাস্তবে কি ঘটেছিল? মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী অত্যন্ত দক্ষতা আর বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, হুজুর যে অর্থ বললেন, একটা অভিধানে এই অর্থটাও আছে, যদি আপনি মিসবাহুল লুগাতের এই অধ্যায়ে খোঁজেন, তাহলে সে উনার সেই অর্থটা পাবেন। কিন্তু যদি আপনি আপনার জ্ঞানের পরিধিটাকে আরেকটু প্রশস্ত করে আরো ৮/১০টি অভিধানের পাতা উল্টান, তাহলে এই শব্দের যে সব অর্থ পাবেন, তাহলোঃ এই কথা বলে তিনি বিভিন্ন অভিধানের উদৃতি দিতে থাকলেন। এক এক করে ১০/১২টি অভিধানের রেফারেন্স দিয়ে তিনি থামলেন, যে সব অভিধানের নাম পর্যন্ত সেই সময়কার প্রিন্সিপাল বা শিক্ষক মন্ডলীর কাছে ছিল অপরিচিত। মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরীর মাত্র একটি শব্দ সম্পর্কে এই ধরণের পান্ডিত্ত দেখে প্রিন্সিপাল আর শিক্ষকমন্ডলী থ’ বনে গেলেন। আর উপস্থিত শ্রোতা সাধারণ সবাই কামাল উদ্দিন জাফরীর জ্ঞানের গভীরতা দেখে উল্লসিত। তারা আওয়াজ তুললেন, নারায়ে তাকবী————————–র।

এর পর সময় গড়িয়ে গেছে, সময়ের পরিবর্তনে মাওলানা নজাবত আলী রিটায়ার্ড হয়েছেন, বার্ধক্য জীবনে ইনতিকাল করেছেন। আমরা ছাত্র জীবনে গাংকুল মাদ্রাসায় পড়াকালীন সময়ে উনার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ নিতাম। বিশেষ করে কোন বিশেষ প্রোগ্রাম হলে বিশেষ কালেকশনের সময়ে আমরা উনা থেকে চাঁদা সংগ্রহের জন্য উনার বাড়ী ফেনাগুলে হাজির হতাম। তিনি সব সময় আওয়ামীলীগের সমর্থক একজন মাওলানা ছিলেন, যিনি ভোট সেন্টারে গিয়ে প্রকাশ্যে বলতেন, আমার নৌকাটা খই-দেখাইয়া দেওছাইন (আমার নৌকাটা কোথায়-দেখিয়ে দাও)। সেই নজাবত আলী সাহেব আমাদের সাথে আলোচনায় বলতেন, জামায়াতের আকীদাতে অনেক সমস্যা আছে, তবে জামায়াতের একটা বিষয় খুবই প্রশংসনীয়। আর তা হলো, জামায়াতে কোন বিদায়াত নাই। এছাড়া তিনি বলতেন, জামায়াতে আলেম মাত্র একজন আছেন, তিনি হলেন জনাব কামাল উদ্দিন জাফরী। তখন আমি ভাবতাম, হায়রে! আমিতো মনে করতাম কামাল উদ্দিন জাফরী মুখস্ত করা ওয়াজ ভুলে যাওয়াতে দ্বিতীয় ওয়াজ শুরু করে তাও ভূলে গিয়েছিলেন।

ফুলতলীর মাহফিল থেকে শিবিরের মিছিলে

আমি তখন গাংকুল মাদ্রাসার ছাত্র। ১৯৮৬ সালের ঘটনা। আমি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। কিন্তু আমি মনে প্রাণে একজন ফুলতলী সমর্থক। ফুলতলী আর শিবিরের পথ যে একই পথ নয়, তা আমার এখনো ধারণা হয়নি। শিবিরের কোন মিটিং বা সমাবেশে অথবা কোন ব্যক্তিগত আলোচনায় কখনোই ফুলতলীর বিরুদ্ধে কোন কথা বলা হয়না। বরং ফুলতলী সাহেব প্রসংগ আসলে তার নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করা হয়। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯৩ এর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় শিবিরের সমাবেশের শ্রেুাতা থেকে বক্তা হয়েছি। কিন্তু কখনোই আমি কোন ইসলামী দলের বিরুদ্ধে বক্তব্য শুনিনি। আমার ব্যক্তিগত জীবনে কখনো কোন ইসলামী সংগঠনের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান করিনি।

ফুলতলী সাহেবের একজন একনিষ্ট মুরিদ হিসাবে যোগদান করলাম কুলাউড়ার আলালপুরে অনুষ্ঠিত বিরাট ঐতিহাসিক ইসলামী মহা সম্মেলনে। ফুলতলী সাহেবের মুরিদানদের জন্য এই মাহফিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা মাহফিল। বিভিন্ন কারণের মাঝে ২টি কারণ উল্লেখ যোগ্য। ১. এই মাহফিলে আসরের নামাযের পর আখনি বিতরণ করা হয়-যা সেই সময়ে কোন মাহফিলে বিতরণ করা হতো না। ২. মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং ফুলতলী সাহেব এবং তিনি মাহফিলের দিন সকালে মুরিদানদের উদ্দেশ্যে স্বহস্তে খাবার বিতরণ করেন। আর আমার কাছে মাহফিলটি গুরুত্ব ছিল তৃতীয় একটি অন্যতম কারণে। আর তা হলো, মাহফিলের সওয়াব হাসিল করা যায়, সাথে রাতের বেলা লিলি সিনেমা হলের একটি শো দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমার একজন খারাপ ক্লাশমেট ছিল মুজিবুর রাহমান-সাতকরাকান্দিতে যার বাড়ী। তার সঙ্গগুনে আমি এই বদঅভ্যাসটির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম “লাভ ইন সিঙ্গাপুর” ছবি দেখার মধ্য দিয়ে। শিবিরের দায়িত্বশীলদের অনেকেই আমার এই বদঅভ্যাসের কথা জানতেন। কিন্তু তারা যে জানতেন, তা আমাকে বুঝতে দিতেন না।

ফুলতলী সাহেবের কুলাউড়ার ওয়াজ মাহফিল শেষ করে লাতুর ট্রেন যোগে বিনা টিকেটে ভ্রমন করে দক্ষিণ ভাগ এসে পৌছলাম পরদিন সকাল বেলা। ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে দেখলাম আমার পরিচিত জন তথা শিবিরের দায়িত্বশীলরা ট্রেনে উঠছেন। তারা আমাকেও ট্রেনে উঠতে বললেন। কারণ বড়লেখায় কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে মিছিল আছে। সাথে সাথে আমি ট্রেনে করে বড়লেখা পৌছলাম। বড়লেখা পৌছার পর শিবিরের দায়িত্বশীলের প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম “তুমি কি টিকেট করেছিলে?” আমি না সূচক উত্তর দেয়াতে সাথে সাথে আমাকে বড়লেখা থেকে দক্ষিণভাগের একটি টিকেট করতে বাধ্য করা হলো। টিকেট করার পর দায়িত্বশীল সেই টিকেট ছিড়ে ফেললেন। কড়া করে বলে দিলেন, আর যেন কোন দিন টিকেট ছাড়া ট্রেনে ভ্রমন না করি। বিকাল বেলা একই দায়িত্বশীল অত্যন্ত স্নেহের পরশে বুঝিয়ে দিলেন, বিনা টিকেটে ভ্রমন করার মাধ্যমে কিভাবে দেশ ও জাতির সাথে দুশমনী করা হয়, কিভাবে অন্য মানুষের হককে ভোগ করা হয়, কিভাবে বিষয়টা হারাম ইত্যাদি।

লাতুন ট্রেনে বড়লেখা পৌছার পর ঐতিহাসিক শিরিশতলা থেকে মিছিল শুরু হলো-এই মুহুর্তে দরকার, কেয়ারটেকার সরকার। মিছিলের শ্লোগানের সাথে গলা মিলাতে মিলাতে এক সময় আমি নিজেই শ্লোগান ধরলাম। আশে পাশে যারা ছিলেন, তারা সাংঘাতিক উৎসাহ দিতে থাকলেন। মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে উপজেলা পরিষদ এলাকা পর্যন্ত ঘুরে এলো। সেই মিছিলের পর বড়লেখা জননন্দিত জননেতা জনাব আব্দুল মান্নান তদানিন্তন সভাপতি জনাব হাফেজ নিজাম ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ছেলেটা কে? এভাবেই আমি শিবিরের মিছিলের শ্লোগানধারী হিসাবে অভিষিক্ত হলাম। এই শ্লোগানের ধারা চলতে থাকলো ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত। এখনো মনে জেগে উঠে সেই সুর “নারায়ে এএএএএএএএএএএএএএ তাকবীীীীর।

সিনেমা হলের মোহ কিভাবে ত্যাগ করলাম

শিবিরের মিছিলের আমি এখন একজন নিয়মিত কর্মী। ১৯৮৬ সালের ঘটনা। আমার ক্লাশমিট জনাব মুজিবুর রহমানের কুমন্ত্রনায় “লাভ ইন সিঙ্গাপুর” ছবিটি দেখেছিলাম কুলাউড়ার পুবালী সিনেমা হলে। যে কথাটা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এর পর থেকে প্রায় প্রতি শুক্রবার আমি কুলাউড়ার যাত্রী ছিলাম। মুড়াউল থেকে জুমুয়ার সময়ে আমি লাতুর ট্রেনে কুলাউড়াগামী হতাম। ফলে দীর্ঘদিন জুমুয়ার নামায কি মিস দেয়া স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। আমার সংগী ছিলেন আমার পাশের বাড়ীতে থাকা শহীদ, যার বাড়ী তালিমপুরে। আরেকজন সাথী ছিলেন, যিনি আমার ছাত্র জামানার বন্ধু, যিনি এখন সমাজে আমার চেয়ে বেশী পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত বলে তার নামটা নিতে পারছিনা। আমরা তিন বন্ধু জমিয়ে সিনেমা দেখতাম সেই জামানায়। বলা যায় সিনেমা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আমরা অন্য যে কোন দুনিয়া থেকে ছিলাম বিচ্ছিন্ন, আর বিষয়টা আমাদের ক্লাশমিটদের সকলের জানা ছিল। আমার দায়িত্বশীলদের প্রায় সকলের জানা থাকলেও তাদের হাবভাব এমন ছিল যে, তারা বিষয়টি জানেন না।

শিবিরের দায়িত্বশীলরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমাকে শিবিরের সাথী করবেন। কিন্তু আমি যে সিনেমা দেখি। আর সিনেমা দেখলে যে সাথী হওয়া যায়না, তা আমার জানা ছিল। বিধায় আমি সাথী হওয়ার প্রতি তেমন আগাচ্ছিলাম না। আমি না আগালে কি হবে, আমাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য উনারা ভিতরে ভিতরে যুদ্ধ শুরু করেছেন।

শিবিরের সাথী হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত “নামায কাযা বন্ধ করা”। এই শর্ত যাতে আমি পুরোপুরি পালন করতে পারি, সে জন্য শিবিরের দায়িত্বশীলরা আমাকে রীতিমতো পাহারা দিতে শুরু করলেন। আমি যেখানে মাসে মাত্র ১৫/২০ ওয়াক্ত নামায পড়তাম, এককথায় যখন সকলের সাথে থাকতাম-তখন নামায পড়তাম, সেখান থেকে পাহারা দিতে দিতে তারা জোহর আসর মাগরিব এবং এশার নামায জামায়াতে আদায় করিয়েই ছাড়লেন। কিন্তু বাকী থাকলো ফজর। একদিন আমার প্রতি শমন জারি হলোঃ রাতের খাবার শেষ করে ঘুমাতে হবে হাফেজ নিজাম ভাইয়ের রুমে। একই রুমে গৌছ ভাইও থাকতেন। আমাকে বাধ্য হয়ে সেই নির্দেশ মানতে হলো। উনারা মূলতঃ পড়ালেখার তত্ত্বাবধানের কথা বলে আমাকে রাতে উনাদের ওখানে নিয়ে যেতেন। কিন্তু তাদের মূল টার্গেট ছিল পরবর্তী ফজরের নামায জামাতে পড়ানো। ধীরে ধীরে আমি ০৫ ওয়াক্ত পাক্কা নামাযী হয়ে গেলাম।

বাকী থেকে গেলো সিনেমা দেখা। শুক্রবারে যেহেতু আমি সিনেমা দেখতে যাই, তাই দায়িত্বশীলরা কৌশলে প্রতি শুক্রবারে আমার জন্য একটা কাজ রেডি করে রাখতেন। আমি সাইকেল চালনায় আগ্রহী ছিলাম। তারা আমাকে সাইকেল চালিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতেন। তখনকার থানা সেক্রেটারী জনাব গৌছভাই সাইকেল চালাতে জানতেন না। তাকে সাইকেলের ডান্ডায় বসিয়ে কত জায়গায় যে নিয়ে গিয়েছি, তার হিসাব কে দেবে। বড়লেখার রাস্তা গুলো তখন এখনকার মতো পিচঢালা ছিলনা। ভাঙা, কাদাযুক্ত, মাটির সড়ক দিয়ে আমরা দক্ষিণ ভাগ থেকে সুড়িকান্দি এবং চান্দগ্রামে সফর করেছি নিয়মিত।

প্রতি শুক্রবারে একটা না একটা কাজ থাকতোই। ভাবটা এমন যে, নজরুল ছাড়া এই কাজ হবেই না। কিন্তু ভিতরে অবস্থা ছিল এমনঃ খোকা, দেখি এখন কিভাবে সিনেমা দেখতে যাও। এই ভাবে চলতে চলতে দীর্ঘদিন আমার সিনেমা দেখাতে যাওয়া হচ্ছেনা। এদিকে দায়িত্বশীলদের সাথে চলতে চলতে এবং উনাদের অশ্লীলতা ও বেহায়পনা বিরুধী এবং পর্দা রক্ষা না করার পরিনাম সংক্রান্ত মটিভেশনের একদিন আমি সত্যিই ধরা খেলাম। নিজেকে একদিন আবিস্কার করলাম সিনেমার বিরুদ্ধে একজন বক্তা হিসাবে। কোন এক বৈঠকে আমাকে অশ্লীলতার বিপক্ষে এবং পর্দা বিষয়ে কথা বলতে দেয়া হলো। তখন আমি সিনেমার বিরুদ্ধে কথা বললাম। এই দিনই দায়িত্বশীল এক সময় কানে কানে বললেন, লিমা তাকুলুনা মা লা তাফয়ালুন-যা করোনা, তা বলো কেন? বললেন, আজ যা বললে-তা তোমাকেই প্রথম আমল করতে হবে।

এভাবেই আমি একদিন সিনেমার মোহ ছেড়ে শামীল হলাম অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা বিরুধী মিছিলে। সেই মিছিল চলছিলো, চলছে এবং তা যেন তাকে অব্যাহত।

নামায রোযার হাকীকত বই খানা আজো মনে দাগ কাটে

১৯৮৬ সালের ঘটনা। স্থানঃ গাংকুল মাদ্রাসা মসজিদ। বিষয়ঃ বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগী হাতে গোনা ৫/৭জন। আমি একজন অন্যতম প্রতিযোগী। ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। তদানিন্তন উপজেলা সেক্রেটারী আবু শাহাদাত মুহাম্মদ গৌছ উদ্দিন সিদ্দিকী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এবং অন্যতম বিচারকও বটে।
আমি তখন শিবিরের একজন উদীয়মান কর্মী বটে। প্রতিযোগিতায় অংশ নিলাম। সেই সময়ের ৫/৭জন প্রতিযোগীর বিশাল সমাবেশকে আমার কাছে এখনকার ৫/৭ শ প্রতিযোগীর অনুষ্ঠানের মতো গুরুত্ববহ মনে হয়েছিল।
প্রতিযোগীতায় হাটু কাঁপাতে কাঁপাতে আমি আমার মনে গহীনে লুকানো প্রায় সব কথা বলার পর যখন বক্তব্য শেষ করলাম, তখন মনে হলোঃ আমি যা বলতে চেয়ে ছিলাম তার মাত্র ১০ শতাংশ বলতে পেরেছি।
বক্তৃতা শেষ হলো। বিচারকরা নম্বর দিলেন। নম্বর যোগ হলো।জনাব গৌছ উদ্দিন ফলাফল ঘোষনা করবেন এবং পুরস্কার দেবেন। এই পুরস্কার ঘোষনাকে কেন্দ্র করে তিনি মুটামুটি মাঝারী ধরনের লম্বা একটি বক্তব্য দিয়ে দিলেন। আমরা মনযোগ দিয়ে বক্তব্য শুনলাম। এর পর আসলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। বিজয়ীর নাম ঘোষনা করা হলো। আমি প্রথম স্থান অধিকার করলাম। আমাকে পুরস্কার প্রদান করা হলো।
এখনকার সময়ে পুরস্কার মানে মনোরম রেপিং পেপারে সাজানো অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক একটি প্যাকেট। কিন্তু তখনকার দিনে তা ছিল না। পুরস্কার হিসাবে পেলাম প্যাকেট বিহীন একটি বই। বইটির নামঃ নামায রোযার হাকিকত। প্যাকেট ছিল কি না, তা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, আমি প্রথম পুরস্কার পেয়েছি।
এর পর বইটা নিয়ে বাসায় এলাম। পুরো বইটা একবার পড়ে নিলাম। বইটির প্রথম অধ্যায় তথা ইবাদত অধ্যায় আমাকে আলোড়িত করলো। আমি এ অধ্যায়টি আবার পড়লাম। আমার কাছে মনে হলো, আমার জানা ইবাদত আর মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ. এর বলা ইবাদতের মাঝে বিস্তর ফরক। কেন জানি মনে হলো, মাওলানা ঘুমন্ত একটা মানুষকে জাগিয়ে দিলেন। আমি ইবাদতকে নতুন করে ভাবতে শিখলাম। ইবাদত সম্পর্কিত নতুন একটি দৃষ্টি ভংগী আমার মাঝে সৃষ্টি হলো। আমি সেই অনুযায়ী ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া শুরু করলাম।
কিছু দিনের মাঝে এই ইবাদত অধ্যায় আমার মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করলো। আমার মাঝে কি যেন অব্যক্ত বেদনা। আমি যেন কি বলতে চাই। পরে আবিস্কার করলাম, আমি যা শিখেছি মাওলানা মওদূদীর নামায রোযার হাকীকত বই পড়ে। সেই বইয়ের বিষয়বস্তু আমি যেন কাউকে বলতে চাই। বলতে না পারার কারণে বারবার আমার কাছে মনে হচ্ছে বলা দরকার।
আমার চেয়ে জুনিয়র কোন একজনের সাথে এক সময় কথা বলার সুযোগ পেলাম। প্রথম সুযোগেই নিজের অজান্তে আমি নামায রোযার হাকিকতে ইবাদত অধ্যায়ের সামারীটা বলে ফেললাম। বলার পর নিজেকে অনেক হালকা হালকা মনে হলো।
আমার জীবনে ইবাদত সম্পর্কে অনেক পড়া হয়েছে, বলা হয়েছে। ইবাদত সম্পর্কে দীর্ঘ ৬মাস কোন এক মসজিদে সাপ্তাহিক ক্লাশে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ হয়েছে। ০৬মাসের চর্বিত চর্বন নিয়ে আবার কথার সুযোগ হয়েছে। দিনে দিনে আমার নোট সমৃদ্ধ হয়েছে। এই বিষয়ে বিভিন্ন দাওয়াতী প্রোগ্রাম এমন কি শিক্ষা বৈঠকেও আলোচনার সুযোগ হয়েছে। আর এই সব আলোচনার নোট তৈরী করতে গিয়ে বিস্তর পড়া লেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু মাওলানার বলা ইবাদত সম্পর্কিত কথামালার মতো এতো সহজ বক্তব্য আর পাইনি।
এরই মাঝে ৩যুগ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নামায রোযার হাকীকতের ইবাদত অধ্যায়টি আমার মানসপটে ভেসে উঠে অমলীন অবয়বে।

একজন ফুলতলী মুরিদের জামায়াত শিবিরে ভাল লাগার কারণ

সময়ের ব্যবধানে একদিন আমি ফুলতলী মাসলাক ছেড়ে ১০০ ভাগ শিবির কর্মী হয়ে গেলাম। ১৯৮৪ সাল থেকে এই অবধি। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় একটি প্রশ্ন বারবার চলে আসে। আর তা হলো এতো ইসলামী সংগঠন, এরপরও আমি কেন ইসলামী ছাত্রশিবির বা জামায়াতে ইসলামীকে বেঁচে নিলাম।

আমি আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশন থেকে জামায়াত শিবির ও অন্যান্য ইসলামী সংগঠন সমূহের মাঝে কিছু মৌলিক পার্থক্য লক্ষ করি। পার্থক্য গুলো পত্রস্ত করলামঃ

১. জামায়াতে ইসলামী কোন ব্যক্তির একক নির্দেশে পরিচালিত হয়না। অন্যান্য ইসলামী দলের প্রায় সবক’টি কোন না কোন ব্যক্তির নেতৃত্বে এবং একেকজন বিশেষ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত।

২. জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের সন্তানেরা সংগঠনে কোন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী নন। অন্যান্য ইসলামী দলে মূল নেতার সন্তান বা সন্তানেরা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী এবং ঐ নেতার অবর্তমানে তার সন্তানেরাই দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পেয়ে থাকেন।

৩. জামায়াতে ইসলামীতে নেতার আনুগত্যের একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, যার কারণে নেতৃবৃন্দ স্বভাবতই স্বতঃস্ফূর্ত মর্যাদার অধিকারী। অন্যান্য ইসলামী দলে সে ঐতিহ্য নেই এবং মূল নেতা ছাড়া প্রায় সবাইই সে মর্যাদা পান না।

৪. জামায়াতে ইসলামীতে রয়েছে সংস্কার ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ‘মুহাসাবা’ পদ্ধতি। অন্যান্য ইসলামী দলে মুহাসাবার কোন প্রেকটিস নেই।

৫. জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পরিচালিত হয় সর্বস্তরের জনশক্তির পরামর্শের ভিত্তিতে। অন্যান্য ইসলামী সংগঠন পরিচালিত হয় একক নেতৃত্বের নির্দেশে।

৬.জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীলেরা সর্বাবস্তায় কোন না কোন ফোরামের নিকট জবাবদিহি করতে দায়বদ্ধ। অন্যান্য ইসলামী দলের দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতার কোন ব্যবস্থা নেই।

৭. জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব নির্বাচিত হয় জনশক্তির প্রত্যক্ষ মতামতের ভিত্তিতে, যেখানে কেউ প্রার্থী হন না বা পদের জন্য কেউ প্রত্যাশী হয়না। আর নেতৃত্ব নির্বাচনে কোন ধরণের ক্যানভাস চলেনা। অন্যান্য ইসলামী দলে নেতৃত্ব নির্বাচন হয়না। যে ব্যক্তি প্রধান দায়িত্বশীল হন, তিনি প্রায়সই স্থায়ী ভাবে সে পদে আসীন থাকেন। কেবল মাত্র নেতৃত্বের প্রত্যাশার কারণে অন্যান্য ইসলামী দল ভেঙে বিভিন্ন উপদল সৃষ্টি হয়।

৮.জামায়াতে ইসলামীর জনশক্তির মানোন্নয়নের রয়েছে একটি স্তর বিন্যাস। যার মাধ্যমে একজন মুমিনকে প্রকৃত মুমিন হিসাবে গড়ে উঠতে প্রচেষ্টা চালানো হয়। যা অন্যান্য ইসলামী দলে অনুপস্থিত।

৯. জামায়াতে ইসলামী আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল সা. প্রদর্শিত বিধান অনুযায়ী মানুষের জীবনের প্রতিটি পর্যায়কে পরিচালিত করার লক্ষ্যে একদল লোক তৈরী করছে। ঐ সব লোকের মাধ্যমে দেশের জনগনের মতামতের ভিত্তিতে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ করতে চায়। অন্যান্য ইসলামী দলে লোক গঠনের এ প্রক্রিয়া অনুপস্থিত।

উপরোক্ত পার্থক্য গুলো বিবেচনায় নিয়ে সংগ্রাম মুখুর এই কাফেলায় ছিলাম, আছি এবং থাকবো। লড়াকুর যত খুন ঝরবে, সব খুন মিশবে এ মাটিতে, পরিণত করে দেবে দেশটা, আমাদের মজবুত ঘাটিতে। আর সেই ঘাটির প্রত্যাশা নিয়ে গাইঃ আমরা ছিলাম, আমরা আছি, আমরাই থাকবো, মুছে যাবো না।

ফুলতলী সাহেবের মাহফিলে মাওলানা এমদাদুল হক এবং

১৯৮৬ সালের কথা। তখন শিবিরে পুরো একটিভ হলেও ফুলতলীর মুরিদ হান্ডেডে হানডেড। সেই সুবাধে গতকাল গিয়েছিলাম তালিমপুরের ওয়াজ মাহফিলে। যেখানকার প্রধান অতিথি ছিলেন ফুলতলী সাহেব কিবলা। তালিমপুরের জাহিদ চাচার বাড়ীতে রাতে থাকা এবং খাওয়া দুইটাই হয়েছে। কারণ উনার ছেলেদের একজন আমার ক্লাশমিট আর আরেকজন বাল্যবন্ধু।

তালিমপুরের ওয়াজের পরদিন ফুলতলী সাহেবের মাহফিল চান্দগ্রামে। তখনকার সময়ে আর এখনকার সময়ে চান্দগ্রাম ফুলতলী সাহেবের বড় মারকায।

এবারের চান্দগ্রামের মাহফিলের একটি বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। আর তা হলোঃ এখানে দূ’জন ব্যতিক্রমী অতিথি আছেন। একজন ফরিদপুরের মাওলানা এমদাদুল হক আর আরেকজন সিলেট আলীয়া মাদ্রাসার কিংবদন্তী মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল মালিক সাহেব। আব্দুল মালিক সাহেবের বিষয়টি তেমন আলোচিত না হলেও এমদাদুল হক সাহেব আপাদমস্তক জামায়াতী ঘরনার ওয়ায়েজ হিসাবে সর্বমহলে পরিচিতি। সাধারণতঃ সেই সময়ে এমদাদুল হক সাহেব যেখানে যান, সেখানে তিনি প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন। কিন্তু চান্দগ্রামে আজ তিনি বিশেষ অতিথি। আর প্রধান অতিথি হলেন ফুলতলী সাহেব কিবলা।

এমদাদুল হক সাহেব চান্দগ্রামের মাহফিলে আসা স্বাভাবিক বিষয় নয়। কিন্তু সেই সময়ে চান্দগ্রামে প্রচন্ড প্রতাপশালী ২জন মুরব্বীর একজন জনাব আলহাজ্ব মুহিবুর রাহমান এবং অপর জন জনাব আব্দুল ওয়াহিদ গ্রাম সরকার (আমার আব্বা) উদ্যোগী হয়েছেন তাদেরকে মেহমান করতে। উনাদের কথা ফেলা যাবে, তদানিন্তন সময়ে এমন দূঃসাহসী মানুষ চান্দগ্রামে ছিলেন না। সেই সময়ে ভিতরে ভিতরে কলকাটি নাড়ছিলেন ডা. লুৎফুর রহমান।

এই বিশেষ আকর্ষণে চান্দগ্রামের মাহফিলটা বিশেষ আকর্ষণীয় এবং সেই সাথে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। আমার জানামতে চান্দগ্রামের ইতিহাসে ওটাই সর্বাধিক লোকের উপস্থিতিতে মাহফিল। মাওলানা এমদাদুল হক সাহেব জোহর নামাযের পরপরই বক্তব্য রাখার কথা। আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম যে, মাহফিলে মারামারি হবে। আর মারামারি উপভোগ করার লোভে একদম মঞ্চের কাছেই আসন নিয়ে বসে পড়লাম।

চান্দগ্রামের মাহফিলের একটা রেওয়াজ আছে। আর তা হলো, যে বক্তা যখনই বক্তব্য রাখেন না কেন, যখন ফুলতলী সাহেব মঞ্চে পৌছবেন, তখন ঐ বক্তা সাথে সাথে তার বক্তব্য শেষ করে ফুলতলী সাহেবের চেয়ারের পাশে মেঝেতে বসে পড়বেন। ফুলতলী সাহেব মঞ্চে আসার পর তাকে এহতেরাম করে কাচুমাচু করবেন। আর ফুলতলী সাহেব আনলিমিটেড সময় ওয়াজ করবেন।

যথারীতি জোহরের নামাযের পরপর এমদাদুল হক সাহেব আসলেন। মঞ্চে আরোহন করলেন। শুরুতেই তদান্তিন সময়ের মাদ্রাসা প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুর রাহমান (বর্ণির হুজুর) ভূমিকা প্রদান করলেন। বললেন, ঈমান আমল সম্পর্কে বয়ান রাখান জন্য। এমদাদুল হক সাহেব তার স্বাভাব সুলভ নিয়মে ওয়াজ শুরু করলেন। কুরআন দেখে দেখে প্রথমে তেলাওয়াত করলেন এবং তেলাওয়াতকৃত আয়াত গুলোর উপরে আলোচনা করলেন। তার আলোচনার এক পর্যায়ে উপস্থিত জনতা আন্দোলিত হয়ে তার সমর্থনে বারবার শ্লোগান দিল।

হঠাৎ করে মাহফিলের চিত্র পালটে গেল। দেখা গেল কিছু অতি উৎসাহী পাবলিক মঞ্চে উঠে গেলো। মঞ্চে একধরণের বিশৃংখল অবস্থা সৃষ্টি হয় হয় অবস্থা। লক্ষ্য করে দেখা গেল জনাব ফুলতলী সাহেব এসে গেছেন। দূর থেকে তার গাড়ীর বহর দেখা যাচ্ছে। এখন তাকে ইসতিক্ববাল করে শ্লোগান দিতে হবে “ফুলতলী সাহেবের আগমন-শুভেচ্ছা স্বাগতম, সাহেব কিবলার আগমন-শুভেচ্ছা স্বাগতম”। তাই আশেকান ও মুরিদানরা মঞ্চে উঠে গেছে। রীতি অনুযায়ী এখন মাওলানা এমদাদুল হক বক্তব্য বন্ধ করে আশেকানদের মাইক দিয়ে ইনি সাহেব কিবলাকে কদমবুছি করে তার চেয়ারের পাশে মেঝেতে বসে যাওয়া। কিন্তু এমদাদ সাহেব তা করলেন না। বরং শত বছরের রীতির বদলে তিনি নিজেই শ্লোগান ধরলেন। উপস্থিত জনতা তার সাথে গলা মিলিয়ে সাহেব কিবলাকে স্বাগতম জানালো। ফুলতলী সাহেব মঞ্চে আসন গ্রহণ করলেন। মাওলানা এমদাদুল হক তার চেয়ারে আসন নিলেন এবং ফুলতলী সাহেবকে পাশে বসিয়ে তার অসমাপ্ত বক্তব্যের দিকে চলে গেলেন। যথারীতি তার বক্তব্য এগুতে থাকলো, আর ফুলতলী সাহেব রীতিমতো রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। চান্দগ্রাম মাদ্রাসার ইতিহাসে এই প্রথম কোন বক্তা তার নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সাথেই তাকে বক্তব্য শেষ করতে হলো। যখন এমদাদুল হক সাহেবের বক্তব্যের সময় শেষ হলো, সাথে সাথে বর্ণির হুজুর কানে কানে সময় শেষ হয়ে গেছে বলে আওয়াজ দিয়ে তাকে শেষ করতে বললেন। কিন্তু ওখানেও রীতিমতো আরেকটি বেয়াদবী করলেন এমদাদ সাহেব। প্রথম বেয়াদবী হলো সাহেব কিবলার পাশে চেয়ারে বসে ওয়াজ করা। আর এখনকার বেয়াদবী হলো সাহেব কিবলার উপস্থিতিতে নিজে মুনাজাত পরিচালনা করা।

এমদাদুল হক সাহেবের ওয়াজ শেষ হলো। তিনি তার আবাসে চলে গেলেন। যাওয়ার সময়ে দেখলাম শতাধিক লোক তাকে অনুসরণ করে তার পিছুপিছু যাচ্ছে। আমি একজন মুরিদে ফুলতলী হিসাবে মাহফিলে বসে থাকলাম।

ফুলতলী সাহেব আসন গ্রহণ করলেন। ইতিমধ্যে তাকে নিয়ে বেশী সম্মাণ দেখাতে গিয়ে তার একজন মুরিদ এমদাদুল হক সাহেব যে কুরআন শরীফ দেখে কুরআন তিলওয়াত করেছিলেন, সেই কুরআন শরীফের উপরে মাহফিলে ব্যবহৃত টেবিল গড়িটি রেখে দিয়েছে। ফুলতলী সাহেব বক্তব্যের শুরতেই সেই কুরআন শরীফ হাতে নিলেন এবং বললেন, ওটা নিয়ে যাও, শিয়ারা আল্লাহর রাসুলের যুগে কুরআন দেখিয়ে দেখিয়ে ওয়াজ করতো। সেদিনের মাহফিল চান্দগ্রামের অন্যান্য মাহফিলের ন্যায় মাহফিল ছিল না। ওখানে ফুলতলীকে ভালবাসেন না এমন মানুষ অনেক ছিলেন। উপস্থিত জনতার মাঝে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম। বিশাল সংখ্যক মানুষ তার এই বক্তব্য শুনার পরপর মাহফিল থেকে উঠে গেলো।

আমি তখন কম বয়সী ও আশেক এবং মুরিদ শ্রোতা হিসাবে বসে থাকলাম। কিন্তু আমার কম জানার মাঝে এমন জানা ছিল যে, শিয়া সম্প্রদায়ের শুরু হয়েছে হযরত আলী রা. এর সময়ে। তাহলে আল্লাহর রাসূল সা. এর সময়ে শিয়া কোথা থেকে আসলো? আমি এ প্রশ্ন করার মতো সাহসী ছিলাম না। আজ অবধি কাউকে সে প্রশ্ন করার সুযোগ পাইনি।

ফুলতলী সাহেবের মাহফিলে মুহাদ্দিস আব্দুল মালিক সাহেব

১৯৮৬ সালের কোন এক সময়ে বড়লেখার চান্দগ্রাম মাদ্রাসার বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে ফুলতলী সাহেব সহ ফুলতলী মাসলাকের উলামায়ে কিরামদের সাথে বিশেষ ব্যতিক্রম হিসাবে অংশ নিয়েছিলেন ফরিদপুরের মাওলানা এমদাদুল হক এবং সিলেট আলীয়া মাদ্রাসার কিংবদন্তী মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল মালিক সাহেব। মাওলানা এমদাদুল হক সাহেবের ওয়াজের বিবরণ গত আলোচনায় আমরা উপস্থাপন করেছি। এ পর্যায়ে একই মাহফিলের অন্যতম বিশেষ অতিথি মুহাদ্দিস আব্দুল মালিক সাহেব নিয়ে আলোচনা করবো। আব্দুল মালিক সাহেব এই মাহফিলে অবাঞ্চিত অতিথিদের মাঝে একজন ছিলেন। আসলে এধরণের মাহফিলে লাঠি সোটা বা সহযোগী পাহারাদার ছাড়া যাওয়া ছিল রীতিমতো দূঃসাহসিকতা। কিন্তু এই দূঃসাহসিক কাজটা করেছেন মাওলানা আব্দুল মালিক মুহাদ্দিস সাহেব। মুহাদ্দিস আব্দুল মালিক সাহেবের পরিচয় দেয়ার মতো আর কিছু বলতে হবে এমন দূঃসাহস আমার নাই। তিনি এই নামেই সর্বমহলে পরিচিত।

দিনের বেলা এমদাদুল হক সাহেব এক ধরণের বিপ্লব করে ফেলাতে ফুলতলী সাহেব বিষম রাগান্মিত ছিলেন। একজন্য পরবর্তী ফুলতলী মাসলাকের নয় এমন বক্তার ব্যাপারে ছিল সতর্ক পাহারা। তার জন্য সময় নির্ধারণ করা হলো এমন সময়, যে সময়ে সাধারণতঃ গ্রামের ওয়াজ মাহফিল গুলোতে উপস্থিতি কম থাকে। মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল উনার আলোচনা শুরুর অনেক আগেই মঞ্চের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। উনার বক্তব্য শুরুর আগেই মাইকে জানিয়ে দিলেন যে, তার আলোচনার বিষয়ঃ ইলম ও আমল। উনি যেন এই বিষয়ের ভিতরই থাকেন এ বিষয়ে তাকে প্রচ্ছন্ন সতর্ক করে দিলেন। অবস্থাটা এমন ছিল যে, কি থেকে কি বলে ফেলে। পরে যদি হিতে বিপরীত হয়ে মুরিদানে কেরাম বিগড়ে যায়।

মাওলানা আব্দুল মালিক মুহাদ্দিস সাহেব আলোচনা শুরু করলেন। তার সময় মাত্র ১ ঘন্টা। আলোচনার শুরুতেই তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে বললেন, বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দেয়া গ্রামাঞ্চলের ওয়াজ মাহফিলে সাধারণ রেওয়াজে নাই। তবে এই নিয়মটা খুবই ভাল। এই প্রেকটিসটা চালু রাখতে পারলে আমাদের খুবই উপকারে আসবে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমি ১ ঘন্টা বক্তব্য রাখবো। এই ১ ঘন্টায় আমি একটা বাক্যও বিষয় বস্তুর বাহিরে বলবোনা ইনশাআল্লাহ।

উনি আলোচনা পেশ করলেন ইলম সম্পর্কে। ইলম সম্পর্কে তিনি অনেক কথা বললেন। আর শ্রোতারা তন্ময় হয়ে শোনলেন। উনার আলোচনার জন্য দেয়া সময় শেষ হতে এখনো ১০ মিনিট বাকী। শ্রোতাদের মনমুগ্ধকর ও তন্ময়াচ্চনতা খানখান হয়ে গেলো যখন প্রিন্সিপাল সাহেব তথা বর্নির হুজুর মঞ্চে আসলেন এবং কানে কানে মুহাদ্দিস সাহেবকে বললেন যে, উনার সময় শেষ হয়ে গেছে। এই প্রথম দেখলাম চান্দগ্রামের কোন মাহফিলে শ্রোতারা দাবী জানালেন, তাকে আরো সময় দেয়ার জন্য। বর্নির হুজুর বাধ্য হলেন, তাকে আরো সময় বাড়ীয়ে দিতে।

সময় বাড়ানো হলো ঠিকই। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মুহাদ্দিস সাহেব বললেন, এতক্ষণ ইলম সম্পর্কে আলোচনা করলাম। এটা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি আলোচনা। আরো একঘন্টা সময় পেলে আমি আপনাদেরকে আমল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ভাব ধারণা দিতে পারতাম। ভবিষ্যতে যদি কোনদিন চান্দগ্রামের দাওয়াত পাই, তাহলে আমল সম্পর্কে বলবো। যেহেতু আমাকে ১ ঘন্টা সময় দেয়া হয়েছে, এবং পরবর্তী বক্তা যেহেতু অপেক্ষায় আছেন। সেহেতু আমি তার প্রতি জুলুম না করে আমি আমার সময়ের মাঝেই আমার কথা শেষ করা উচিত বলে মনে করি। ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।

মুহাদ্দিস আব্দুল মালিক সাহেব তার জীবনে আর কোন দিন চান্দগ্রামে আসেননি। সেই যুগ আর এই যুগ, কোন যুগের মানুষ তার আমল সম্পর্কিত আলোচনার শুনার সুযোগ পায়নি। কিন্তু আমলের ময়দানে বৃদ্ধ বয়সেও তিনি সব সময় চিরযৌবনা। মুহাদ্দিস আব্দুল মালিককে সব সময় বৃদ্ধ বয়সে দেখা গেছে মিছিলের অগ্রভাগে। কথিত আছে, তার মিছিলের দিনে ছেলেদের তিনি কখনো বাসায় থাকতে দিতেন না। তার সাথে যারা তার ফিফটি মটর সাইকেলের পিছনে বসার সুযোগ পেয়েছেন, তারা সাক্ষী-তিনি ড্রাইভিং এর শুরু থেকে শেষ অবধি পুরো সময়টা কুরআন তেলাওয়াতে কাটিয়ে দিতেন। সেই সব মুরব্বী মুহাদ্দিসরাই কবি নজরুলের বাসায় প্রকৃত যুবক। আর আমাদের মতো যারা ফেইসবুকে কি বোর্ড মাস্টারী করি, তারা যুবক নয়। বরং তারা সেই সব যুবক, যাদের উর্দির নিচে বার্ধক্যের জীর্ণ কংকাল লুকিয়ে থাকে।

আপ-ইঞ্জিন আপ, ডাউন-ইঞ্জিন গো, দু-ইঞ্জিন টাচ, বয়লার বাস্ট

১৯৮৭ সালের কথা। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাথী সম্মেলন। স্থানঃ শেরে বাংলা নগর রফতানী মেলা মাঠ। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চলছে ব্যাপক অর্থ কালেকশন। বড়লেখা থানা শিবিরের সাংগঠনিক এলাকা বড়লেখার পুরো ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে। এককথায় বর্তমানের পূর্বজুড়ি এবং পশ্চিম জুড়ি ইউনিয়ন ছিল বড়লেখা থানা শিবিরের অধীনে।

তখন মৌলভী বাজার জেলা শিবির একক ভাবে সাংগঠনিক কাজ না চালিয়ে চলতো হবিগঞ্জ-মৌলভী বাজার সাংগঠনিক জেলা নামে। সভাপতি ছিলেন বর্তমান সিলেট (উত্তর) জেলা জামায়াতের আমীর জনাব হাফেজ আনোয়ার হোসাঈন খান।

আমি তখন শিবিরের নতুন শপথ নেয়া সাথী। ৪ঠা জানুয়ারী ১৯৮৭ সালের বাদ ফজর আমি শপথ নিয়েছি। সেই হিসাবে শরীরের রক্ত গরম তুলনামূলক ভাবে অন্য সকলের চেয়ে। আমরা জেলা কোঠা পুরণ করার জন্য সীমাহীন চেষ্ঠা চালিয়ে টার্গেটের কাছাকাছি পৌছতে পেরেছি-যা ছিল মৌলভী বাজার জেলার শাখা গুলোর মাঝে সবচেয়ে বড় কোঠা। এই কোঠা কালেকশন করতে গিয়ে আমরা বড়লেখা উপজেলার সম্ভাব্য সকল এলাকা চষে বেড়িয়েছি। ইতিমধ্যে কোঠার ৮ হাজার টাকা জেলা সভাপতির কাছে হস্তান্তর করার জন্য একজন ভাই মৌলভী বাজার সফর করেছেন। কোঠা ছিল ১০ হাজার। কালেকশন হয়েছে ৮ হাজার। একদম ছোট ব্যাপার নয়। আশা করি জেলা সভাপতি সম্মাণের সাথে গ্রহণ করে বড়লেখার সাথীদের ধন্যবাদ জানালেন।

পরদিন সকাল বেলা। উপজেলা সভাপতির জরুরী তলব। আমি এবং আকমল ভালকে যেতে হবে জুড়ি এলাকায়। সেখানে নয়াবাজার মাদ্রাসা থেকে জনাব আব্দুল মান্নান মানিককে সাথে নিয়ে কালেকশনে যেতে হবে। কারণ, জেলা সভাপতির কড়া নির্দেশ আরো ২ হাজার টাকা যে কোন উপায়ে কালেকশন করতে হবে।

উপজেলা সভাপতির নির্দেশে লাতুর ট্রেনে করে জুড়ি স্টেশনে নামলাম। পায়ে হেটে নয়াবাজার মাদ্রাসায় হাজির হলাম। সেখানে জনাব আব্দুল মান্নান মানিক এবং আব্দুল মালিক মতলিব ভাইকে সাথে নিয়ে আমি আর আকমল ভাই দিনভর বিভিন্ন জায়গায় কালেকশন করলাম। আমার মনে পড়ে সেখানে টালিয়াউরা নামে একটা বাজার আছে। মাগরিবের সময় সেখানে আমরা তরকারী বিক্রেতার নিকট থেকে ২৫ পয়সাও কালেকশন করেছিলাম।

সেই দিনের ঘটনা। মতলিব ভাই আমাদেরকে নিয়ে এলাকার গন্যমান্য এক ব্যক্তির বাড়িতে গেলেন। ঐ ব্যক্তির নাম আমার এই মুহুর্তে মনে নেই। তিনি আমাদেরকে অত্যন্ত সম্মাণ দিলেন, আমরা বড়লেখা থেকে এসেছি জেনে আলাদা একটা সম্মাণ দিলেন। দীর্ঘ সময় জুড়ে আমাদের সাথে খোশগল্প করলেন। সে সময়ের বয়সে উপলব্দি করতে না পারলেও এখন উপলব্দি করি যে, ঐ ব্যক্তি এমন একজন লোক ছিলেন যিনি মানুষের সাথে গল্প করতে ভালবাসতেন এবং তার অভ্যাস ছিলঃ তিনি শুধু বলবেন, আর সবাই মনযোগ দিয়ে শুনবেন। আমরা বাধ্য ছাত্রের মতো তা কথা শুনতে থাকলাম। উল্লেখ্য যে, আমরা আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য কিন্তু সেখানে পৌছেই বলে দিয়েছি। এখন তার থেকে জবাব পাওয়ার পালা। কমপক্ষে এক ঘন্টা জুড়ে তিনি তার বক্তৃা এবং উপদেশ নামা শুনালেন। আমরা প্রতিক্ষায় ছিলাম, আমাদেরকে তিনি কি দেন। আমার মনে মনে ধারণা ছিল তিনি কমপক্ষে ২শ টাকা প্রদান করবেন। এক সময় তিনি তার পকেট থেকে চকচকে নোট বের করলেন। চোঁখ বন্ধ করলে এখনো সেই টাকার গন্ধ পাই। এর আগে কখনো এতো নতুন নোট আমি দেখিনি। তিনি তার পকেটে গুনেই নোট গুলো বের করেছেন। এক এক করে ৩০টি নোট আমাদের দিলেন। আমরা টাকার পরিমাণ কত সে দিকে খেয়াল নেই। বরং টাকার নতুন নোট গুলোর দিকেই মনযোগ। অবশেষে তার থেকে সর্বমোট ৩০ টাকা কালেকশন করতে পেরে গর্বিত হয়ে বিদায় নিলাম।

বিদায়ের আগে উনি আমাদেরকে একটি নসিহত করলেন। বললেন, ভাষার উপর আমাদের দখল থাকতে হবে। তাহলে আমরা জীবনে অনেক উন্নতি করতে পারবো। তিনি বললেনঃ আপ-ইঞ্জিন আপ, ডাউন-ইঞ্জিন গো, টু ইঞ্জিন টাচ, বয়লার বাষ্ট।

তিনি বললেন, এক জামায় এই ধরণের ইংরেজী দিয়ে পার পাওয়া যেতো। কিন্তু আগামী দিনের পৃথিবীতে এই ধরণের ইংরেজী চলবেনা। তাই ভাষার উপর দখল থাকতে হবে পুরো মাত্রায়।

তিনি ঘটনার বিবরণ দিলেন এই ভাবেঃ তখনকার দিনে রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টাররা খুব বেশী শিক্ষিত ছিলেন না। আর শিক্ষিত থাকলেও ইংরেজী জ্ঞান খুব বেশী ছিলনা। ইংরেজের জামানা। হঠাৎ করে একদিন রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন দূর্ঘটানা ঘটলো-দূ’টি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ। উপর থেকে বড় বাবু আসলেন। জিজ্ঞেস করনে, ঘটনা কিভাবে ঘটলো। ইংরেজ বড় বাবুকে এখন মাষ্টার সাহেব কিভাবে বুঝাবেন! বাংলা বললেতো আর উনি বুঝবেন না। তাই তিনি ইংরেজীতে বললেনঃ আপ ইঞ্জিন আপ, ডাউন ইঞ্জিন গো, টু ইঞ্জিন টাচ, বয়লার বাস্ট। অর্থাৎ এদিক থেকে একটা ট্রেন আসছিল, বিপরীত দিক থেকে আরেকটি ট্রেন আসলো। এমতাবস্তায় দুই ট্রেনের মাঝে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো এবং বয়লার বাস্ট হয়ে গেলো।

১৯৮৭ থেকে ২০১৭ ৩০ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু কর্মজীবনের ফাঁকে ফাঁকে, বাঁকে বাঁকে দেখি তার কথাগুলো কতইনা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যখনই ভাষা সমস্যায় পড়ি, তখন সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে।

জননেতা আব্দুল মান্নান, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং আমার তৃপ্তির হাসি

১৯৮৬ সালের মাঝামাঝি সময়। আমার রক্ত কণিকার কারেন্ট তখন চলে সর্বোচ্চ গতিতে। কারণ তখন আমি ইসলামী ছাত্রশিবিরের একজন সক্রিয় কর্মী। সুজাউল মাদ্রাসা থেকে চান্দগ্রাম মাদ্রাসা হয়ে ভর্তি হয়েছি গাংকুল মাদ্রাসায়। শিবিরের সাথী শপথ নেয়ার জন্য দিওয়ানা হালত।
শিবিরের সাথী হওয়ার জন্য ২টা শর্ত আমাকে বড়ই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। সংগঠনে সময় দেয়ার কাজ, সংগঠনের কিছু বই নোট করা আর কিছু কুরআন হাদীস মুখস্ত করার কাজটা অনেক আগেই আমি সেরে রেখেছি। কিন্ত বিব্রতকর ২টি শর্তের বেড়াজালে বন্দি হয়ে আমি সাথী হতে পারছিনা। শর্তগুলো হলোঃ
১. একাধারে কমপক্ষে ৩ মাস নামায কাযা বন্ধ থাকতে হবে।
২. সাথীদের জন্য নির্ধারিত অধ্যয়নের সিলেবাস পড়ে শেষ করতে হবে।
প্রথম শর্ত ৩মাস নামায কাযা বন্ধ থাকা। এই শর্তটা পুরণ করতে করতে ২মাস ১৫ দিনের মাথায় ব্রেক ফেল করেছে। আবার শুরু করেছি। ৩মাসের ভিতরে অন্য প্রস্তুতিটা সেরে নিতে পারলেই হলো।
দ্বিতীয় শর্ত সিলেবাস। সিলেবাসের সকল বই পড়া শেষ করেছি। মাত্র ০১টি বই ছাড়া। বইটির নাম “ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা”। লিখেছেনঃ ড. আব্দুল করিম জায়দান। বাজারে সে বই নাই। সংগঠনের লাইব্রেরীতেও এই বই নাই।
শ্রদ্ধাভাজন ডা. হিফজুর রহামন বললেন, মান্নান ভাইয়ের কাছে পেতে পারেন। সেই সুবাদে একদিন হাজির হলাম জননেতা আব্দুল মান্নান ভাইয়ের বাড়ীতে। বড়লেখার শহরের পাদদেশ মুড়িরগুল এলাকাতে উনার বাড়ী।
জনাব আব্দুল মান্নান ভাইয়ের বাড়ীতে পৌছে আমার চোঁখ ছানাবড়া। যে দিকে তাকাই, শুধু বই বই আর বই। বাঁশবেতের বেড়া দিয়ে তৈরী ঘরে আমাকে বসতে দেয়া হলো, উপযুক্ত আপ্যায়নও করানো হলো। আমাকে সীমাহীন সমাদর করা হলো। কিন্তু সমস্যা হলো, আব্দুল মান্নান ভাইয়ের বিশাল বই ভান্ডার সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত আলমিরা নাই। একজন প্রাইমারী স্কুল মাষ্টার যেখানে পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে নান্দনিক আলমিরাতে বই সাজিয়ে রাখবেন, সেই সুযোগ আর সামর্থ কোথায়?
আমার বই খোঁজা শুরু হলো। সেই সুযোগে জনাব আব্দুল মান্নান ভাইয়ের বই গুলোও একটু গুঁছিয়ে নিচ্ছি। দেখলাম, একই বইয়ের যতটি সংস্করণ বা মুদ্রণ বের হয়েছে, জনাব আব্দুল মান্নান তার প্রতিটিই কমপক্ষে ১কপি ক্রয় করেছেন। তিনি যেখানেই যেতেন, কিছু বই কিনতেন। আমার এখনো মনে পড়ে নামায রোযার হাকিকত মোট ১৪ কপি বই পেয়েছিলাম তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে। কিন্তু আমার কাংখিত সেই “ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা” নামক বইটি পাচ্ছিনা।
অনেক চেষ্টা, পরিশ্রমের মধ্যে চলে গেলো কমপক্ষে ৩ঘন্টা। তিনিও ইতিমধ্যে আমাকে সহযোগিতা করেছেন অনেক। কিন্তু বইটি পাওয়া গেলো না। এর মাঝে আপ্যায়ন শেষ হলো, জনাব আব্দুল মান্নান আমার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে নিলেন। তিনির সম্পর্কে আমার কিছুই জানা হলো না। কারণ তাকে আমি কোন প্রশ্ন করবো, এমন বয়স, সাহস, যোগ্যতা কিছুই আমার ছিলনা। জামায়াতের আন্দোলনে কিংবদন্তী তূল্য মানুষটা তখন আমার কাছে এবং আমার তুলনায় ছিলেন অনেক অনেক উঁচুতে থাকার এক ব্যক্তিত্ব।
হতাশ মন নিয়ে যখন উনার বাসা থেকে বিদায় নেবো ভাবছি, এমন অবস্থায় হাজার বইয়ের স্তুপে কাভার ছাড়া একটি বইয়ের দিকে নজর গেলো। প্রথম ৫/৬ পৃষ্টা ছাড়া একটি বই হাতে নিয়ে দেখি সেই বই আমার কাংখিত সেই বইঃ ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা।
জনাব আব্দুল মান্নানের কাছে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা খোঁজতে গিয়ে কে দেখে আমার তৃপ্তির হাসি। মাত্র ১দিনে আমি পুরো বই পড়ে শেষ করি। কারণ তখন আমার রক্ত কণিকায় প্রবাহিত হচ্ছিলো সর্বোচ্চ মাত্রার বিদ্যুৎ প্রবাহ। আমি সাথী হবো, আমি সাথী শপথ নেবো।
আমার শ্রদ্ধেয় আব্দুল মান্নান ভাই অসুস্থ। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।
আমার ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা এখনো স্বপ্নে, তা যেন দেখা দেয় বাস্তবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s